ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে সারের ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উত্তপ্ত হয়ে ওঠেছে সরাইল বিএনপি। গত শুক্রবার তালিকা প্রকাশের পরই দলের ত্যাগী নির্যাতিতদের বাদ দিয়ে আওয়ামী দোসর জুলাই যুদ্ধ বিরোধী মামলার আসামীকে ডিলারশীপ দেওয়ার অভিযোগে ভাইরাল হয়ে গেছে ফেসবুক। কমেন্সে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন অনেক নেতা কর্মী ও সমর্থক। এসব অভিযোগের তীর স্থানীয় বিএনপি’র দায়িত্বশীল ব্যক্তির বিরূদ্ধে। ইশারা করা হচ্ছে ইউএনও ও কৃষি কর্মকর্তার দিকেও। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যেশ্যে দল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সতর্ক বার্তা দিয়েছেন উপজেলা বিএনপি নেতা ও ছাত্রদলের সাবেক আহবায়ক জামাল হোসেন লস্কর। উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে গতকাল শনিবার কাঁদাছুড়াছুড়ি বন্ধ, আসামী গ্রেপ্তার ও তালিকা সংশোধনের আহবান জানিয়ে ফেসবুকে ষ্ট্যাটাস দিয়েছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নুরূজ্জামান লস্কর তপু।
অনুসন্ধান, ফেসবুক ও দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, নিয়োগের সকল পক্রিয়া শেষ করে গত শুক্রবার সরাইল উপজেলার ৯ টি ইউনিয়নে নিয়োগ পাওয়া ৯ জন ডিলারের তালিকা প্রকাশিত হয়। কিছুক্ষণ পরই অনেকের ফেসবুক ভেরিফাইড আইডিতে নিয়োগে নানা ধরণের অনিয়মের অভিযোগ লিখা ষ্ট্যাটাস ভাইরাল হতে থাকে । একাধিক নেতা কর্মী লিখেন- তালিকা থেকে অর্থনৈতিক সুবিধাসহ রহস্যজনক কারণে দলের ত্যাগী নির্যাতিত ও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের বানোয়াট মামলায় কারাবরণকারী নেতা কর্মীদের বাদ দেয়া হয়েছে। ডিলারশীপ দেয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের দোসর ও জুলাই যোদ্ধা হত্যা মামলার আসামীকে। এসব ষ্ট্যাটাসে দলীয় নেতা কর্মী ও সমর্থকরা নানা ধরণের কমেন্স করেন। বিশেষ করে বিএনপির সভাপতি বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আনিছুল ইসলাম ঠাকুরকে দায়ী করা হয়। তারা লিখেন নোয়াগাঁও ইউনিয়নে ছাত্রদলের সাবেক আহবায়ক কারাবরণকারী চাকরিচ্যুত নেতা জামাল লস্কর ডিলারের আবেদন করেছিলেন। জামালকে বাদ দিয়ে আওয়ামী দোসর, যাত্রাবাড়ি এলাকায় জুলাই যোদ্ধা হত্যা মামলার ১৩৬ নম্বর আসামী মো. বিল্লাল মিয়াকে ডিলারশীপ দেয়া হয়েছে। ২/১টি ছাড়া বাকি ইউনিয়ন গুলোতে দলের ত্যাগীদের বঞ্ছিত করা হয়েছে। ক্ষুদ্ধ হয়ে সরাইল উপজেলা বিএনপি’র ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক সদ্য সাবেক ছাত্রদলের আহবায়ক ও জাতীয়তাবাদী আইন ছাত্র ফোরাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার আহবায়ক জামাল হোসাইন লস্কর তাঁর ফেসবুক ভেরিফাইড আইডিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সতর্ক বার্তা দিয়ে লিখেন-‘হ্যালো মাননীয়, প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান আপনার দলের ধ্বংস নিশ্চিত। আপনি বলেছিলেন মিছিলের শেষ কর্মীটি মূল্যায়ন পাবে কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে প্রথম কর্মীটি অস্তিত্ববিলীন। সময় কিন্তু এক রকম যায় না-খারাপ সময় যেকোনো মূহুর্তে।’ জামালের এমন ষ্ট্যাটাসে আশ্চর্য অভিভূত হয়েছেন দল ও সরাইলবাসী। জামাল বলেন, আন্দোলন সংগ্রাম করতে ১২-১৪টি মামলার আসামী হয়েছি। ১৭ বছর বাড়ি ছেড়ে বনে জঙ্গলে ঘুমাইলাম। অনাহারে অর্ধাহারে কাটাইলাম। রাজনীতির জন্য চাকরিচ্যুত হলাম। কারাবরণ ও রিমান্ড নির্যাতনের শিকার হয়েছি। একাধিকবার ক্রস ফায়ারে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইলাম। আজ বিএনপি নেতা আমার নাম বাদ দিয়ে আওয়ামী দোসরের জন্য তদবির/ সুপারিশ করেন। যেকোন মুহুর্তে কল রেকর্ড প্রকাশ করা হবে। দ্রূত সংবাদিক সম্মেলনও করা হবে। উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক আহবায়ক জুলাই রণাঙ্গণের সামনের সারির যোদ্ধা রিফাত বিন জিয়া বলেন, ফ্যাসিস্ট জুলাই হত্যাকারী কিভাবে লিস্টে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে? আমরা শুধু বিএনপি’র নেতা নয়, সংশ্লিষ্ট সকলের কাছেই জবাব চাইব। এ বিষয়ে বিএনপি’র কোন প্রতিবাদ না থাকার কারণও জানতে চাইব। কৃষক দলের আহবায়ক ও সার বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য মশিউর রহমান বলেন, সদস্য না হয়েও বিএনপি নেতা কিভাবে সভায় থাকেন? উপজেলায় যদি বিএনপি’র কোন কর্মী সারের ডিলার পাওয়ার দাবী রাখেন সেটা হবে রিগান বা আমি মশিউর। এহেন পরিস্থিতিতে গতকাল শনিবার নিজের ফেসবুক ভেরিফাইড আইডিতে বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নুরূজ্জামান লস্কর তপু লিখেছেন- ফেসবুকে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করূন। জুলাই হত্যা মামলার আসামী হিসেবে উল্লেখ করা ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার ও তাঁর নামে বরাদ্ধ দেয়া সার ডিলারশীপ বাতিলে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। ওই পোষ্টে তিনি বলেছেন-‘সার ডিলার নিয়োগ ও বরাদ্ধের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের এখতিয়ারভূক্ত। রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা সুপারিশ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। মো. বিল্লাল মিয়া বলেন, একটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বুড্ডা গ্রামে আমার প্রতিপক্ষ তৈরী হয়েছে। এরা আমার যেকোন কাজে ষড়যন্ত্র বা বিরোধীতা করে। আমরা বাপ দাদার আমল থেকেই বিএনপি করে আসছি। শুধু আমার প্রাপ্তিটাকে নষ্ট করার মনগড়া ও বানোয়াট অভিযোগ করা হচ্ছে।
উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি আনিছুল ইসলাম ঠাকুর উনার বিরূদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ ও সার ডিলার নিয়োগে স্থানীয় বিএনপি’র হস্তক্ষেপের বিষয় অস্বীকার করে বলেন, সকল আবেদন সরাইল উপজেলা কৃষি অফিস যাচাই-বাচাই করে জেলায় ডিডি অফিসে পাঠিয়েছেন। সেখান থেকে সরকারি ভাবে ডিলার নিয়োগ দিয়েছেন। এখানে সরাইল বিএনপি’র কোন ধরণের সম্পৃক্ততা বা হস্তক্ষেপ নেই। তবে তৎকালীন (বর্তমানে শায়েস্থাগঞ্জের দায়িত্বে) কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ একরাম হোসেন মুঠোফোনে বলেন, নিয়োগে আমাদের কোন ক্ষমতা ছিল না। উপজেলা ও জেলার নেতাদের সুপারিশ, পরামর্শ বা মতামতের ভিত্তিতে আমরা সরকারি লোকজন একটি ডায়াগ্রাম তৈরী করে প্রেরণ করেছি।