নানামুখী চাপে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অস্থিরতা বাড়ছে। দেশে বিগত ২০১৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি পুলিশ বাহিনী। তারপরও বর্তমানে রাজনৈতিক বিষয়ে পুলিশের ওপর বাড়ানো হচ্ছে চাপ। পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীতে নতুন করে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে। খোঁজা হচ্ছে বিগত সরকারের সমর্থক পুলিশ সদস্যদের। সেজন্য প্রস্তুত করা হয়েছে অ্যাকশান প্ল্যান। সরকারের নীতিনির্ধারকদের আশঙ্কা, পুলিশের ভেতর লুকিয়ে থাকা ষড়যন্ত্রকারীদের নেটওয়ার্ক রয়েছে। তদন্তে দিন দিন ষড়যন্ত্রকারীদের সংখ্যা বাড়ছে। সেজন্য বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা, চেইন অব কমান্ড বা শৃঙ্খলা নষ্ট করা এবং অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ সৃষ্টির পেছনে সক্রিয়দের প্রায় সবাইকে তালিকার আওতায় আনা হচ্ছে। আর তালিকাভুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা, চাকরিচ্যুত করা এবং নিয়মিত মামলা দায়েরের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়া জোরদার করা হচ্ছে। তাছাড়া পুলিশ সদস্যরা এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল বিপাকে রয়েছে। কারণ কোনো এলাকায় ঝটিকা মিছিল হলেই তার দায় ডিসি-ওসিকে নিতে হচ্ছে। ওই লক্ষ্যে পুলিশ বাহিনীতে ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নেয়াও শুরু হয়েছে। এ অবস্থায় কে কখন শাস্তির মুখোমুখি হবে না নিয়ে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অস্থিরতা বাড়ছে। পুলিশ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থক পুলিশ সদস্যরা রাতারাতি বিএনপি সেজে নতুন ষড়যন্ত্রে সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাছাড়া বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও আরেকটি দলের গুপ্ত সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নেয়। মূলত তখন সমন্বয়ক চ্যানেল অপব্যবহার করে অনেককে রাতারাতি প্রাইজ পোস্টিং দখল করে। ফলে আশঙ্কা জেগেছে, বর্ণচোরা ষড়যন্ত্রকারী ও বিএনপিবিরোধীরা পুলিশ বাহিনীতে শক্ত অবস্থান করে নিয়েছে। পরিস্থিতি উন্নয়নে ইতোমধ্যে ধাপে ধাপে শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে এবং আরো অনেকের নাম তালিকায় যুক্ত হচ্ছে। বর্তমান সরকার পুরো পুলিশবাহিনীকে একটি পেশাদার ও জনবান্ধব বাহিনীতে রূপান্তরের লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করছে। তাছাড়া পুলিশের ভেতর তৈরি করা হচ্ছে একটি ডেডিকেটেড গ্রুপ। ওই গ্রুপে থাকছে বিএনপিপন্থি পুলিশ কর্মকর্তারা।
সূত্র জানায়, দেশের পুলিশ প্রশাসনে বদলি ও পদায়নসংক্রান্ত দুর্নীতি সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়, যা পোস্টিং বাণিজ্য নামে পরিচিত। আর ওই পোস্টিং বাণিজ্যে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন ঘটে। বিশেষ করে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পদায়নে পোস্টিং বাণিজ্য বেশি ঘটে। যদিও সরকারের নতুন নীতিমালায় পুলিশে আর কোনো পোস্টিং বাণিজ্য বন্ধ এবং যোগ্যতা, সততা, মেধা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতেই পদায়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সেজন্যই ঢাকার বিভিন্ন থানায় কীভাবে ও কোন প্রক্রিয়ায় ওসিদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে। ঢাকার ওসি নিয়োগের নেপথ্যে কারা, কার মাধ্যমে কতো টাকার লেনদেন হয়েছে এবং কোন প্রভাবশালী গোষ্ঠী সুপারিশ করেছে তদন্তের আওতায় এসব বিষয় আনা হচ্ছে। যারা অবৈধ প্রক্রিয়ায় অর্থ দিয়ে কিংবা অসাধু উপায়ে ঢাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ওসি হিসাবে পোস্টিং নিয়েছে এবং যারা ওই বাণিজ্যের মূল কারিগর, উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। সেজন্য পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তে মাধ্যমে বেগবান করা হচ্ছে ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া।
সূত্র আরো জানায়, ব্যাপক ধরপাকড় ও কড়া নজরদারির পরেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের অপতৎপরতা ঠেকানো যাচ্ছে না। বরং আচমকাই বিভিন্ন জায়গায় বের হচ্ছে ঝটিকা মিছিল। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ নিয়ে একাধিক মিটিং করলেও মিলছে না ভালো ফল। ফলে নতুন করে ধরপাকড় বাড়ানো হয়েছে। তবে শুধু পুলিশের পক্ষে ঝটিকা মিছিল নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। সেজন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ ও পর্যাপ্ত গোয়েন্দা তথ্য। ইতিমধ্যে বাড়ানো হয়েছে পুলিশের চেকপোস্ট ও টহল। পাশাপাশি থাকছে বিশেষ নজরদারি। নিরাপত্তায় থাকছে পুলিশ, ডিবি, সিটিটিসিসহ বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরা নিরাপত্তায়। কিন্তু তারপরও হুটহাট মিছিলের ঘটনা ঘটছে। আর সরকার তা ভালোভাবে নিচ্ছে না। ফলে কোনো মিছিল হলেই পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের কাছে মন্ত্রণালয় থেকে কেন মিছিল ঠেকানো গেলো না জানতে চাওয়া হচ্ছে। অথচ বিগত সরকারগুলোর সময়ও সরকার বিরোধী মিছিল করেছে। তাতে কোনো পুলিশ কর্মকর্তাদের হয়রানির মুখে পড়তে হয়নি। বর্তমানে পুলিশ বাহিনীতে যে ধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপন হচ্ছে তাতে আরো কমবে পুলিশের মনোবল।
এদিকে পুলিশের শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদল করা হয়েছে। অতিরিক্ত আইজিপি ও ডিআইজি পদমর্যাদার ১১ কর্মকর্তাকে বর্তমান সরকার বদলি ও নতুন দায়িত্বে পদায়ন করেছে। তার মধ্যে বিশেষ শাখা (এসবি), পুলিশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি, ট্যুরিস্ট পুলিশ, কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল এবং ঢাকা ও খুলনা রেঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে রদবদলের পুলিশের গোয়েন্দা ইউনিট এসবিতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। একই সঙ্গে ঢাকা রেঞ্জের নেতৃত্বেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
অন্যদিকে সমপ্রতি পুলিশের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ জানান, কোনো এলাকায় আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) লোকজন ঝটিকা মিছিল করলে তার দায় ওই থানার ওসি ও এলাকার ডিসিকে নিতে হবে। কমিশনারের ওই বক্তব্যের পর ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়েছে। গুলশানে ঝটিকা মিছিল হওয়ায় গুলশাল বিভাগের উপপুলিশ কমিশনারকে (ডিসি) ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। তার আগে গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রত্যাহার করা হয়।
আর আইজিপি আলী হোসেন ফকির সমপ্রতি এক অনুষ্ঠানে জানান, পুলিশ বাহিনীর ভেতরে ষড়যন্ত্রকারী রয়েছে। ইতোমধ্যে তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। সরকারকে বিব্রত করতে এবং অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে বিভিন্ন মাধ্যমে নানা ধরনের অপচেষ্টা ও ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে। পুলিশ বাহিনীতে অপরাধ বা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত সদস্যের সংখ্যা খুবই সীমিত। ওই অতি ক্ষুদ্রসংখ্যক দুর্নীতিপরায়ণ বা বিতর্কিত সদস্যের অনিয়মের দায় গোটা পুলিশবাহিনী নেবে না। ষড়যন্ত্রকারী এবং অপেশাদার সব পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অন্যদিকে এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী জানান, পুলিশ বাহিনীতে যারা ষড়যন্ত্রকারী হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে যাদের এরকম ভূমিকা থাকবে, প্রত্যেকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সংক্রান— সংসদীয় কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল অবেদীন বলেন, সব বিষয় নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। কাউকে ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই।
DNT UP