নকল পাঠ্যবইয়ের থাবায় শিক্ষার্থী ও প্রকাশকরা

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:০৪ এএম
নকল পাঠ্যবইয়ের থাবায় শিক্ষার্থী ও প্রকাশকরা

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বইয়ের বাজারে এনসিটিবি অনুমোদিত পাঠ্যবইয়ের নকল সংস্করণের মারাত্মক বিস্তার ঘটেছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি শক্তিশালী অসাধু চক্র অনুমোদিত আসল বই আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারে পৌঁছানোর আগেই হুবহু প্রচ্ছদ অনুকরণ করে ভুল ও মানহীন বই ছড়িয়ে দিচ্ছে। এতে লাখো শিক্ষার্থী প্রতারিত হচ্ছেন, দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হচ্ছে বৈধ প্রকাশকদের এবং সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। নকল বই তৈরির এমন অপরাধচক্রের বাস্তব প্রমাণ মিলেছে সমপ্রতি রাজধানীর হাজারীবাগে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর হাজারীবাগের ঝাউচর গুদারাঘাট সংলগ্ন একটি নামহীন ছাপাখানায় অভিযান চালায় থানা পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। সেখানে মানিক মিয়া নামের এক ব্যক্তির মালিকানাধীন প্রেসে অক্ষরপত্র প্রকাশনীর ‘বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিতি’ এবং হাসান বুক হাউজের পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানসহ বিভিন্ন অনুমোদিত বইয়ের বিপুল পরিমাণ ফর্মা ও কাভার অবৈধভাবে বাঁধাইয়ের জন্য প্রস্তুত অবস্থায় পাওয়া যায়। কিন্তু পুলিশ যখন জব্দ তালিকা তৈরি করছিল, তখন ফয়সাল ও মাসুদ রানা নামের দুই ব্যক্তির নেতৃত্বে ২০-২৫ জনের একটি দল এসে চড়াও হয়। তারা রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে পুলিশ ও প্রকাশকদের কাজে বাধা দেয় এবং হামলা জানায়। শেষ পর্যন্ত পুলিশের পক্ষে জব্দ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি এবং থানা পুলিশ ‘সমঝোতার’ অজুহাতে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। যদিও মাসুদ রানা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বিষয়টিকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন, কিন্তু এই প্রশাসনিক শিথিলতা ও রাজনৈতিক ছত্রছায়া নকল চক্রকে আরও উৎসাহিত করছে। নকল বইয়ের কারণে সবচেয়ে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সদ্য এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তি হওয়া লাখো শিক্ষার্থী। নীলক্ষেত বা স্থানীয় লাইব্রেরি থেকে আসল বই মনে করে শিক্ষার্থীরা যে বইগুলো কিনছে, পরবর্তীতে শ্রেণিকক্ষে গিয়ে দেখছে সেগুলোর ভেতরে মারাত্মক ভুল। অনেক ক্ষেত্রে পুরনো সিলেবাসের লেখা নতুন প্রচ্ছদে বাঁধাই করে বাজারজাত করা হয়েছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান ও ব্যাকরণের মতো জটিল বিষয়ে ভ্রান্ত তথ্য, ভুল সমীকরণ ও সংকেত শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি সাধন করছে। তাছাড়া নিম্নমানের কাগজ ও অস্পষ্ট মুদ্রণ পড়ার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করছে। পরবর্তীতে ভুল বুঝতে পেরে আবার অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে আসল বই কিনতে বাধ্য হওয়ায় সাধারণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। অন্যদিকে, এনসিটিবির অনুমোদিত বই প্রকাশের জন্য নিবন্ধিত বৈধ প্রকাশকদের প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। তাদের নিয়ম মেনে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে (এনসিটিবি) নির্দিষ্ট পরিমাণ রয়্যালিটি দিতে হয়, লেখক ও সম্পাদকদের সম্মানীর ব্যবস্থা করতে হয় এবং আধুনিক প্রেস ও উন্নতমানের কাগজ ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু অবৈধ ছাপাখানা চালানো এই প্রতারক চক্র কোনো প্রকার রয়্যালিটি, সম্পাদকীয় খরচ বা মানসম্পন্ন কাগজের তোয়াক্কা না করে অত্যন্ত সস্তায় নকল বই তৈরি করছে। এর ফলে তারা বাজারের মূল দামের চেয়ে কম বা সমপরিমাণ দামে তা বিক্রি করে বিশাল অঙ্কের অবৈধ মুনাফা লুটে নিচ্ছে। এতে বৈধ প্রকাশকরা বাজারে চরম অসৎ ও অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে বিশাল আর্থিক লোকসান গুনছেন, যা দেশের প্রকাশনা শিল্পকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এছাড়া, শিক্ষার্থী ও প্রকাশকদের ক্ষতির পাশাপাশি এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র যেভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক রাজস্ব হারাচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি অনুমোদিত পাঠ্যবই মুদ্রণ ও বিক্রির ওপর সরকারের নির্দিষ্ট রাজস্ব পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু গোপন ছাপাখানায় তৈরি এসব বই সম্পূর্ণ ছায়া অর্থনীতি বা অনানুষ্ঠানিক উপায়ে বেচাকেনা হয়। প্রথমত, বেআইনিভাবে বই ছাপানোর কারণে এনসিটিবি তার পাওনা কোটি কোটি টাকার রয়্যালিটি থেকে সরাসরি বঞ্চিত হচ্ছে, যা পাঠ্যপুস্তক উন্নয়ন ও শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে ব্যবহৃত হওয়ার কথা ছিল। দ্বিতীয়ত, অলিখিত নগদ লেনদেনের মাধ্যমে এসব নকল বই বাজারে বিক্রি হওয়ায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিপুল পরিমাণ ভ্যাট ও কর থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এতে প্রতিবছর রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দুর্বল তদারকি এবং প্রশাসনিক উদাসীনতার সুযোগ নিয়েই মূলত এই চক্রটি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন রক্ষা, প্রকাশনা খাতকে বাঁচানো এবং সরকারের রাজস্ব ফাঁকি বন্ধে এখনই কঠোর ব্যবস্থার বিকল্প নেই। এর জন্য এনসিটিবি, রাজস্ব বোর্ড ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করে অবৈধ প্রেসে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে হবে। একই সাথে বইয়ের আসল রূপ চেনার জন্য বিশেষ হলোগ্রাম বা কিউআর কোড যুক্ত করা এবং রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব উপেক্ষা করে জালিয়াত চক্রের মূল হোতাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এদিকে প্রকাশকরা বলছেন, সামগ্রিকভাবে, পাঠ্যবইয়ের এই অবৈধ নকল চক্র শুধু একটি ব্যবসায়ী অপরাধ নয়, বরং এটি জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা, দেশের অর্থনীতি এবং তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের ওপর সরাসরি এক ধরনের চরম আঘাত। এই প্রাণঘাতী সংকট থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত ও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। প্রথমত, এনসিটিবি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের গোপন ছাপাখানাগুলোতে অবিলম্বে নিয়মিত ও কঠোর অভিযান পরিচালনা করতে হবে। নকল বই বিক্রির সাথে জড়িত লাইব্রেরিগুলোর নিবন্ধন বাতিল এবং জালিয়াতির অপরাধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পাঠ্যবইয়ের আসল রূপ চিহ্নিত করতে হলোগ্রাম বা স্ক্যানযোগ্য ডিজিটাল কিউআর কোডের প্রবর্তন করতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা মুহূর্তের মধ্যেই আসল বই যাচাই করতে পারে। একই সাথে, অভিযান চলাকালে বা পরবর্তীতে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক অপপ্রভাব যেন না ঘটে, তা কঠোরভাবে নিশ্চিত করা জরুরি। রাষ্ট্রীয় রাজস্ব রক্ষা করা, বৈধ প্রকাশনা শিল্পকে টিকিয়ে রাখা এবং সর্বোপরি লাখো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনকে সঠিক ও নিরাপদ রাখার স্বার্থে এখন থেকেই সরকারকে এই অপশক্তির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিতে হবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে