তালপাতা আর দোয়াত-কালির সেই শিক্ষকের বাড়িতে ইউএনও

এফএনএস (বরিশাল প্রতিবেদক) : | প্রকাশ: ৬ অক্টোবর, ২০২৬, ০৩:৩৯ পিএম
তালপাতা আর দোয়াত-কালির সেই শিক্ষকের বাড়িতে ইউএনও

দশ টাকার শিক্ষক মনিরুজ্জামান এলাহি-যার হাতে গড়ে উঠেছিল প্রজন্মের প্রথম অক্ষর। তালপাতা আর দোয়াত-কালিতে যার কাছে শুরু হয়েছিল শিক্ষার পথ। জীবনের শেষপ্রান্তে সেই শিক্ষক জরাজীর্ণ ঘরে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

স্থানীয়দের কাছে খবর পেয়ে বিশ্ব শিক্ষক দিবসে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল ইউনিয়নের হস্তিশুণ্ড গ্রামে সেই শিক্ষক মনিরুজ্জামান এলাহির বাড়িতে খাদ্য সহায়তা নিয়ে হাজিয়ে হয়েছিলেন ওই উপজেলার মানবিক উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজা।

স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, তালপাতায় অক্ষর লেখা, দোয়াত-কালিতে হাতেখড়ি আর কাঠের পাটিতে বসিয়ে শিশুদের পড়ানো, এভাবেই একসময় গ্রামের শিশুদের শিক্ষাজীবনের সূচনা করেছিলেন মনিরুজ্জামান এলাহি। পারিশ্রমিক হিসেবে নিতেন মাত্র ১০ টাকা। সেই থেকে স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিতি পান ‘দশ টাকার মাস্টার’ নামে।


শিশুদের শিক্ষাজীবনের প্রথম অক্ষর শেখাতে জীবনের দীর্ঘ সময় কাটানো এই প্রবীণ শিক্ষক এখন বয়সের ভারে অনেকটা নুজ্য হয়ে পরেছেন। জরাজীর্ণ ঘরে আর্থিক সংকটের মধ্যে তার দিন কাটছে। তার এ দুরবস্থার খবর পেয়ে বিশ্ব শিক্ষক দিবসে সোমবার (৫ অক্টোবর) ওই শিক্ষকের বাড়িতে ছুটে গেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজা। তিনি (ইউএনও) প্রবীণ শিক্ষক মনিরুজ্জামান এলাহির সাথে কথা বলে তার শারীরিক অবস্থা ও পারিবারিক পরিস্থিতির খোঁজখবর নিয়েছেন। পরে তার হাতে তাৎক্ষনিক খাদ্য সহায়তা তুলে দিয়েছেন।


উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রবীণ এই শিক্ষককে আর্থিক সহযোগিতা দেয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থার আশ্বাস দিয়েছেন ইউএনও মো. আলী সুজা। পাশাপাশি ইতিহাসের নিরব স্বাক্ষী এ প্রবীণ শিক্ষকের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে তাকে একটি ঘর করে দেয়ার জন্য সমাজের বিত্তশালীদের সহযোগিতা চেয়েছেন ইউএনও আলী সুজা।


স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, নব্বইয়ের দশকে হস্তিশুণ্ড গ্রামের দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুদের শিক্ষার প্রথম পাঠ দেয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন শিক্ষক মনিরুজ্জাান এলাহি। তালপাতায় লেখা, দোয়াতে কালি তৈরি এবং শিশুদের হাতে ধরে অক্ষর শেখানোর মধ্যদিয়ে শুরু হতো তার পাঠদান।


এলাহির কাছে হাতেখড়ি নেয়া অনেক শিক্ষার্থীরা বর্তমানে চাকরি, ব্যবসাসহ বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত। তবে একটি প্রজন্মের শিক্ষার সূচনালগ্নে ভূমিকা রাখা সেই শিক্ষকই এখন জীবনের শেষসময়ে এসে চরম আর্থিক দৈন্যদশায় পরেছেন।


স্থানীয় শিক্ষক নুরুল ইসলাম মোল্লা জানিয়েছেন, মনিরুজ্জামান এলাহির কাছে হাতেখড়ি গ্রহণ করা অনেক শিক্ষার্থীরা আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত। একটি প্রজন্মের জন্য তিনি নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেছেন। তিনি আরও বলেন, শিক্ষক মনিরুজ্জামান এলাহি বিয়ে করেননি। তিনি শিক্ষাদানকেই জীবনের বড় অংশজুড়ে সঙ্গী করে অন্যের সন্তানদের শিক্ষার প্রথম অক্ষর চিনিয়েছেন। অথচ জীবনের শেষপ্রান্তে এসে তার নেই স্থায়ী কোনো আয়ের উৎস, নেই নিয়মিত সরকারি সহায়তা। জরাজীর্ণ বাড়িতেই কষ্টে দিনাতিপাত করছেন এক প্রজন্মের ইতিহাসের স্বাক্ষী মনিরুজ্জামান এলাহি।

ইউএনও মো. আলী সুজা বলেন, বিষয়টি আমার নজরে আসার পরই আমি দশ টাকার মাস্টার এলাহির খোঁজ নিয়েছি। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তার সাথে সাক্ষাত করতে বাড়িতে গিয়েছিলাম। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে আর্থিক ও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি শিক্ষক মনিরুজ্জামান এলাহির জীবনের শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী তাকে একটি ঘর নির্মান করে দেয়ার জন্য তিনি (ইউএনও) সমাজের সামর্থ্যবান সকলকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়ার জন্য আহবান করেছেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে