বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কর্তৃক

প্রণীত গবেষণা অর্থায়ন পরিচালনা নির্দেশনা প্রত্যাখান দাবিতে শিক্ষকদের মানববন্ধন

এফএনএস (খাইরুল ইসলাম বাসিত; পাবনা) : | প্রকাশ: ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:২৮ পিএম
প্রণীত গবেষণা অর্থায়ন পরিচালনা নির্দেশনা প্রত্যাখান দাবিতে শিক্ষকদের মানববন্ধন

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কর্তৃক প্রণীত গবেষণা অর্থায়ন পরিচালনা নির্দেশনা-২০২৬ প্রত্যাখান দাবিতে পাবিপ্রবির সাধারণ শিক্ষকদের মানববন্ধন অনুষ্ঠিত।

আজ সোমবার (৫ অক্টোবর ) দুপুরে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষকবৃন্দ এই মানববন্ধন করেন। মানববন্ধন শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. আবুল হাসনাত মো. শামীম মহোদয়ের নিকট স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বিজন কুমার ব্রহ্ম ।

মানববন্ধনে বিভিন্ন দাবি তুলে ধরে পাবিপ্রবি ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক আশিকুর রহমান অভি বলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) গবেষণা অনুদান এবং গবেষণার মান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে গবেষণা প্রকল্পে প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর (পিআই) হিসেবে আবেদনের ক্ষেত্রে প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকদের সুযোগ না থাকা এবং পিএইচডি বিহীন অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকদের সুযোগ সীমিত বা বাতিল হওয়ার বিধান পুনর্বিবেচনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ কামনা করছি।

আমাদের মূল আবেদন হলো শুধু পদমর্যাদা বা নির্দিষ্ট ডিগ্রির ভিত্তিতে বৈষম্য সৃষ্টি  না  করে গবেষণার সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা ও গবেষণা প্রস্তাব্নায় মানের ভিত্তিতে যোগ্য গবেষকদের পিআই হিসেবে প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়া।

শিক্ষকের পদমর্যাদা তাঁর একাডেমিক অবস্থান নির্দেশ করলেও গবেষণা প্রকল্পে নেতৃত্বের সামগ্রিক সক্ষমতা নির্ধারণ করে না। গবেষণা প্রকাশনার মান, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা, গবেষণাপদ্ধতির জ্ঞান, পূর্ববর্তী প্রকল্পে অংশগ্রহণ, দল পরিচালনা এবং বাজেট ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জনকারী প্রভাষক বা সহকারী অধ্যাপককে শুধু পদমর্যাদার কারণে আবেদনের সুযোগ থেকে বাদ দিলে সম্ভাবনাময় গবেষণা প্রস্তাব প্রতিযোগিতার শুরুতেই হারিয়ে যেতে পারে।

পিএইচডি গবেষণাগত প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ; তবে প্রকল্প পরিচালনার সক্ষমতা মূল্যায়নে প্রকাশনা, অভিজ্ঞতা ও প্রস্তাবনার মানও বিবেচ্য। পিএইচডি-সংক্রান্ত শর্তসহ যোগ্যতার মানদ- সব পদমর্যাদার গবেষকের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট, ন্যায্য ও সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন।

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২১৩ জন শিক্ষকের মধ্যে প্রায় ৭৫.৫৯ শতাংশের পিএইচডি ডিগ্রি নেই। পিআই হিসেবে আবেদনের জন্য পিএইচডি ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করা হলে অনেক যোগ্য শিক্ষক স্বাধীনভাবে গবেষণা প্রকল্পে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন। ইউজিসির এ ধরনের বিধান পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের অন্যান্য বিকাশমান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ গবেষণা নেতৃত্ব গঠনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। আমরা মনে করি, এটি বর্তমান সরকারের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার প্রসার এবং ন্যায় ও সমতাভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক গবেষণা পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যের পরিপন্থী।

গবেষণায় নেতৃত্ব বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে গড়ে ওঠে। প্রকল্পের দায়িত্ব পেলে তরুণ গবেষকরা পরিকল্পনা, তথ্য বিশ্লেষণ, গবেষণার নৈতিকতা, দল পরিচালনা, অর্থ ব্যবস্থাপনা ও ফলাফল প্রকাশে দক্ষতা অর্জন করেন। দীর্ঘদিন কেবল সহযোগী গবেষক হিসেবে কাজ করলে স্বাধীন নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা অর্জন বিলম্বিত হয়। তাই নবীন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককাঠামো, অবকাঠামো এবং পিএইচডিধারী শিক্ষকের অনুপাত বিবেচনায় মানসম্মত ও নমনীয় যোগ্যতা কাঠামো প্রয়োজন। পিআই হিসেবে আবেদনের ন্যূনতম শর্ত হতে পারে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষক হওয়া, গবেষণার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক একাডেমিক যোগ্যতা, নির্ধারিত গবেষণা অভিজ্ঞতা ও মানসম্পন্ন প্রকাশনা থাকা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা প্রদর্শন করা। গবেষণা প্রস্তাবনাকেও নির্ধারিত মান পূরণ করতে হবে।

অতিরিক্ত যোগ্যতা হিসেবে পিএইচডি, উচ্চমানের আন্তর্জাতিক প্রকাশনা, সাইটেশন, পূর্ববর্তী অনুদান ও প্রকল্প পরিচালনা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, পেটেন্ট, উদ্ভাবন এবং গবেষণার সামাজিক বা নীতিগত প্রভাব বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রস্তাবনা মূল্যায়নের কেন্দ্রে থাকবে গবেষণা সমস্যার গুরুত্ব, মৌলিকত্ব, গবেষণাপদ্ধতির দৃঢ়তা, গবেষকের পূর্ববর্তী অর্জন, বাস্তবায়ন ও বাজেট ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা এবং সম্ভাব্য জাতীয় ও সামাজিক প্রভাব। সুনির্দিষ্ট সূচক, স্বচ্ছ নম্বর প্রদান, বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নাম-পরিচয় গোপন রেখে প্রস্তাবনা মূল্যায়নের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।

প্রথমবার পিআই হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া যোগ্য তরুণ গবেষকের প্রকল্পে অভিজ্ঞ অধ্যাপক বা সহযোগী অধ্যাপককে কো-পিআই হিসেবে যুক্ত করা যেতে পারে। বড় বা জটিল প্রকল্পে জ্যেষ্ঠ গবেষকের পরামর্শ এবং গবেষণা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। এতে তরুণদের নেতৃত্বের সুযোগের সঙ্গে মান ও জবাবদিহিতা বজায় রাখা সম্ভব হবে।

১।  প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকসহ সকল শিক্ষককে পিআই হিসেবে আবেদনের সমান সুযোগ দেওয়া হোক। গবেষণা অভিজ্ঞতা, প্রকাশনা, পিএইচডি অথবা সমমানের গবেষণা যোগ্যতার সমন্বয়ে সুস্পষ্ট মানদ- নির্ধারণ করা যেতে পারে।

২। পিএইচডিবিহীন অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে অযোগ্য না করে তাঁদের প্রকাশনা, গবেষণা অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব ও সামগ্রিক সক্ষমতা মূল্যায়নের সুযোগ রাখা হোক।

৩। পদমর্যাদার পরিবর্তে প্রমাণিত গবেষণা যোগ্যতা ও প্রস্তাবনা মানকে প্রাধান্য দিয়ে স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্যায়ন কাঠামো প্রণয়ন করা হোক।

৪। নবীন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তবতা ও পূর্ববর্তী অনুদান ব্যবস্থার নজির বিবেচনায় নীতিমালা পুনর্মূল্যায়ন করা হোক। নীতিমালা প্রণয়ন বা সংশোধনের আগে শিক্ষক-গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময় করা হোক। উল্লিখিত বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ইউজিসির চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট আনুষ্ঠানিক পত্র এবং বর্তমান পিআই যোগ্যতার বিধান পুনর্বিবেচনার জন্য তথ্যভিত্তিক প্রস্তাব পাঠানোর অনুরোধ জানাচ্ছি। প্রস্তাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককাঠামো, গবেষণার সক্ষমতা এবং বিকল্প যোগ্যতা কাঠামো তুলে ধরা যেতে পারে। একই সঙ্গে অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে বিষয়টি বৃহত্তর গবেষণানীতির সংস্কার হিসেবে উপস্থাপন এবং প্রয়োজনে ইউজিসির সঙ্গে শিক্ষক-গবেষকদের মতবিনিময় সভা আয়োজনের উদ্যোগ কামনা করছি। যোগ্যতার ভিত্তিতে আবেদনের সুযোগ, বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন এবং সর্বোত্তম গবেষণা প্রস্তাব নির্বাচনই আমাদের দাবির মূল কথা। এই আবেদন ব্যক্তিগত সুবিধা বা গবেষণার মান শিথিল করার উদ্দেশ্যে নয়। জ্যেষ্ঠ গবেষকদের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি যোগ্য তরুণ গবেষকদের নেতৃত্বের সুযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার ধারাবাহিকতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। অতএব, বিষয়টি সদয় বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণের জন্য আপনার হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

মানববন্ধনে বক্তব্য প্রদান করেন ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আরিফুল ইসলাম, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান মো. আশিকুর রহমান অভি, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এস. এম শাহেদুল আলম, সমাজকর্ম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক, মোছা. ফাতেমা বেগম , অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক  ফারজানা ইয়াসমিন। সনিয়র শিক্ষকদের মধ্যে থেকে উক্ত দাবীর সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে বক্তব্য প্রদান করেন ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর ও চেয়ারম্যান ড. মো. কামরুজ্জামান, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, ড. মো. খাইরুল ইসলাম, রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. হুমায়ুন কবিরসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য সাধারণ শিক্ষকবৃন্দ।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে