বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে আমার বন্ধুবর নড়াইল কালেক্টরেট স্কুলের প্রধান শিক্ষক উজির আলীর লেখাটি প্রকাশ করা যায় কিনা দেখার অনুরোধ রইল মোঃ উজির আলী শিক্ষা একটি জাতির উন্নয়নের বাহক। আর শিক্ষক হলো আদর্শ ও উন্নত জাতি গড়ার কারিগর। দেশের শিক্ষারমান উন্নয়নে শিক্ষকের জীবনমান উন্নয়ন খুবই জরুরি। একটি ফলগাছ লাগানো হলেও গাছটি না বাঁচলে যেমন ফল আশা করা যায় না, তেমনি শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়ন না করলে শিক্ষার মানোন্নয়ন আশা করা যায় না। একটি দেশের উন্নয়নের মূল চালিকা শক্তি হলো শিক্ষা।
কিন্তু, সেই শিক্ষকগণকে তাদের জীবনমান উন্নয়নের দাবি নিয়ে বছরের পর বছর আন্দোলন করতে হয় রাজপথে। এমনও আছে মহান পেশায় নিয়োজিত এই শিক্ষকগণ তাদের জীবনমান উন্নয়নের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে রক্তাক্ত হয়েছে রাজপথে। এমন কি লাশ হয়েও বাড়ি ফিরেছেন! একটা সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশের জন্য এটা লজ্জার!
স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫৪ বছর পর এখনো জাতি গড়ার কারিগর, মহান পেশায় নিয়োজিত জাতির এই সেবকদের চোখে-মুখে শুধুই হতাশার ছাপ। শিক্ষক সমাজ ও বিভিন্ন সংগঠনের দাবি, এমপিওভুক্ত ও নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা, সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে শতভাগ মাধ্যমিক ও সমমনা এবং উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমনা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়করণ প্রয়োজন।
বিজ্ঞজনরা বলেন, শিক্ষকদের সমাজ গঠনের কাজে পূর্ণ মনোযোগ দিতে হলে তাদের জীবনযাত্রার মান ও নিরাপত্তা রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক শব্দটির মধ্যে কোনো বৈষম্য না থাকলেও সরকারি শিক্ষক ও বেসরকারি শিক্ষক শব্দের বিশাল বৈষম্য রয়েছে। পুকুর আর সাগরের মধ্যে যেমন পার্থক্য বিদ্যমান।
দেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিশাল একটি অংশই পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারি ভাবে। ক্ষুদ্রতম একটি অংশ পরিচালিত হচ্ছে সরকারি ভাবে। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশের ২১ হাজার ৪৬৩ টি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২০ হাজার ৭৬৭ টি বেসরকারি। যা মোট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯৬ দশমিক ৭ শতাংশ। বাকিগুলোর মধ্যে ৬৯৬টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো জেলা বা উপজেলা শহর এলাকাতে অবস্থিত। এখানে শুধু শহরের শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার সুযোগ পায়।
পক্ষান্তরে গ্রামাঞ্চলে সকল বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হওয়ায় সেখানে সাধারণত গ্রামের সাধারণ পরিবারের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করে। সরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষক-কর্মচারীসহ অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। কিন্তু, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা একবুক কষ্ট আর হতাশা নিয়ে স্কুল দৈনিক পাঠদান দেন। আর অবকাঠামো উন্নয়নের চেষ্টায় প্রধান শিক্ষকের দিক-বিদিক ছোটাছুটি করতে হয়।
সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ মাস শেষে একটি ভালো মানের বেতন ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পান আর তাদের ভবিষ্যত (পেনশন) নিশ্চিত করা থাকে। বেসরকারি বিদ্যালয়ের (এমপিও ভুক্ত) শিক্ষকগণ মাস শেষে সরকারি অংশের বেতন ও ভাতা পান, যা সরকারি স্কুলের তুলনায় খুবই কম। বেসরকারি শিক্ষকদের পেনশনও সীমিত হয়। আর নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ কোনো সুযোগ সুবিধাই পান না। তাঁরা মানবেতর জীবনযাপন করেন। তাদের পরিশ্রম সমান, সকল নিয়ম-কানুন সমান, তবে কেন বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় এতো বৈষম্য?
ফিনল্যান্ড, জাপান বা সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে মেধা তালিকার শীর্ষে থাকা তরুণরাই শিক্ষকতায় আসেন। কারণ সেখানে শিক্ষকদের জীবনমান এবং রাষ্ট্রীয় সুবিধা সর্বোচ্চ পর্যায়ের। আমরা যদি বিশ্বমানের সুনাগরিক তৈরি করতে চাই, তবে আমাদের শিক্ষকদের জীবনমানকেও বিশ্বমানে উন্নীত করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার সময় এসেছে।
সরকারি স্কুলগুলোর বেশির ভাগই শহরে অবস্থিত হওয়ায় গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা আরো বেশি চ্যালেঞ্জিং ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। যা শিক্ষায় বৈষম্য তৈরি করছে। তাই সকল মাধ্যমিক ও সমমনা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই নীতিমালার মধ্যে এনে সকল শিক্ষকদের উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান করে বেতন-ভাতায় সমতা আনা প্রয়োজন। আমেরিকান শিক্ষাবিদ ইউজিন পি বার্টিন বলেছেন, শিক্ষকরা যেখানে আগামী প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ বা জ্ঞান জমা করছেন, সেখানে তাদের নিজেদের জীবন যেন চরম আর্থিক অনটনে না কাটে, তা নিশ্চিত করা সমাজেরই দায়িত্ব। তাই শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে চাইলে সরকারকে অবশ্যই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের সকল বেসরকারি এমপিওভুক্ত, নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করতে হবে। মেধাবী-দক্ষ শিক্ষক ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের যোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে ধাপে ধাপে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা যেতে পারে। যে কোনো রাষ্ট্রে শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে হলে সর্ব প্রথম শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়ন করতে হবে। শিক্ষকগণের জীবনমান উন্নয়ন, তাদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলেই তারা তাদের মেধা ও মনন সঠিক ভাবে শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ করতে পারবেন। যার ফলে অচিরেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভব হবে। উন্নত রাষ্ট্র বিনির্মাণে শিক্ষায় সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হবে।