স্বর্ণ চোরাচালানে ধরা পড়ছে শুধুই বাহক, অধরা মূল সিন্ডিকেট

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:১৬ এএম
স্বর্ণ চোরাচালানে ধরা পড়ছে শুধুই বাহক, অধরা মূল সিন্ডিকেট

দেশের প্রধান আকাশপথ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন বিমানবন্দরে কড়া নজরদারি, সিসিটিভি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একের পর এক অভিযানের পরও থামছে না স্বর্ণ চোরাচালান। উদ্ধারকৃত বিপুল পরিমাণ সোনা ও গ্রেপ্তারকৃতদের তালিকা দেখে আপাতদৃষ্টিতে কর্তৃপক্ষের সাফল্য মনে হলেও, এটি মূলত বিমানবন্দরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভয়াবহ ছিদ্র এবং অসাধু চক্রের শেকড় কতটা গভীরে-তা ফুটে তুলছে। পুলিশ ও কাস্টমসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত সাড়ে ১০ বছরে (২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত) বিমানবন্দর থানায় স্বর্ণ চোরাচালান-সংক্রান্ত ৬৯৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। কেবল ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে অন্তত ১,৯০৬ কেজির বেশি স্বর্ণ, যার আনুমানিক বাজারমূল্য হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। সমপ্রতি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই ঢাকা বিমানবন্দরে সিটের নিচ থেকে ৯.৩৩ কেজি, যার মূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা এবং মধ্য-সেপ্টেম্বরে ওয়াশরুম থেকে প্রায় ৭ কোটি টাকার স্বর্ণ জব্দ করা হয়। এর আগে জুলাইয়ে একটি ফ্লাইটের কার্গো হোল্ড থেকে ১৮.৭২ কেজি এবং গত মার্চে দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটের টয়লেট থেকে উদ্ধার করা হয় ১৮ কেজি ওজনের ১৫৩টি স্বর্ণবার, যেগুলোর মূল্য প্রায় ৩৮ কোটি টাকা স্বর্ণ। এর বাইরে সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতেই প্রায় ১৪ কেজি (১২০টি স্বর্ণবার, মূল্য প্রায় ২৫.২০ কোটি টাকা) স্বর্ণ নিজ দেহের বেল্টে লুকিয়ে পাচারের সময় বিমানের কারিগরি সহকারী (টেকনিক্যাল হেলপার) সোয়েব গাজী সজিব আটক হন। খাতসংশ্লিষ্ট ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, চোরাচালানের এই সুবিশাল নেটওয়ার্ক টিকিয়ে রাখতে বিমানের ভেতরের লোকজনকে কোটি টাকার লোভে ম্যানেজ করা হচ্ছে। পাইলট, কেবিন ক্রু, ইঞ্জিনিয়ারিং ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং স্টাফ, লোডার, এমনকি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কর্মীদের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলছে। বিমানের উড়োজাহাজে এমন কিছু সংরক্ষিত স্থান বেছে নেওয়া হয়, যেখানে সাধারণ যাত্রীদের প্রবেশের সুযোগ নেই। বিশেষ করে উড়োজাহাজের কার্গো হোলের অন্তর্মুখী পার্শ্বের ‘প্যানেল বক্স’, যেখানে ইউটিলিটি পাইপ ও সংবেদনশীল কানেক্টিভিটি থাকে এবং স্ক্রু দিয়ে আটকানো ১২টি পর্যন্ত বক্স থাকে, এটিকে সবচেয়ে নিরাপদ মনে করে চোরাকারবারিরা। ইতিহাসে ১২৪ কেজি স্বর্ণের চালানটি এই প্যানেল বক্সেই আনা হয়েছিল। এছাড়া বিমানের টয়লেটের টিস্যু বক্স, কমোডের পার্শ্ববর্তী স্থান, লুকিং গ্লাসের পিছন, গ্যাস মাস্ক সকেট, বিমানের সিটের নিচে এবং বিমানবন্দরের ওয়াশরুমকে গুপ্তভাণ্ডার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে জব্দকৃত স্বর্ণের পরিমাণ পরিসংখ্যানে কিছুটা কমলেও চোরাচালান কমেনি; বরং চক্রগুলো প্রযুক্তিনির্ভর ও নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ধারণা অনুযায়ী, মোট চোরাচালানের মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ ধরা পড়ে। ফলে বাকি বিশাল অংশটি নজরদারির আড়ালে বাইরে চলে যাচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মামলা এবং গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়লেও তদন্তে মূলত ধরা পড়ছে চুনোপুঁটি বা নিম্নস্তরের ক্যারিয়ার (বাহক)। অনেক ক্ষেত্রে পরিত্যক্ত চালান উদ্ধারের পর মূল হোতা বা মাস্টারমাইন্ডদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। বিমানে কোনো কর্মী ধরা পড়লে সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও মূল সিন্ডিকেট তাদের বেশভূষা ও নাম পাল্টে পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। শুল্ক গোয়েন্দা ও ঢাকা কাস্টমস হাউজের কর্তারা জানিয়েছেন, নজরদারি জোরালো থাকার কারণেই এই চালানগুলো ধরা পড়ছে। তবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে এই ঘটনা বেশি ঘটায় প্রতিষ্ঠানটিকে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছে। বিমান কর্তৃপক্ষের দাবি, অপরাধের দায় ব্যক্তিবিশেষের, প্রতিষ্ঠান তা নেবে না এবং জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু বাহক ধরে এই আন্তর্জাতিক পাচার রোধ করা সম্ভব নয়। এটি বন্ধ করতে হলে জরুরি শতভাগ ব্যাগেজ স্ক্যানিং এবং হ্যাঙ্গারে নেওয়ার আগে একাধিক সংস্থার উপস্থিতিতে বিমান পরিদর্শন নিশ্চিত করা, এআই (অও)-ভিত্তিক রিস্ক প্রোফাইলিং চালুকরণ, প্যানেল বক্স ও সংরক্ষিত এলাকায় মালামাল লোড-আনলোডের সময় কঠোর সিসিটিভি ও গোয়েন্দা নজরদারি রাখা, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া। এবং আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয় বৃদ্ধি করা।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে