রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত মাদকের বিস্তার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বহু এলাকাতেই এটি এখন এক ধরনের সমান্তরাল অপরাধ অর্থনীতির রূপ নিয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, মাদক নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি খুব একটা চোখে পড়ছে না। মাদকের সঙ্গে অপরাধের সম্পর্ক বহু পুরোনো। যেখানে মাদকের বিস্তার ঘটে, সেখানে সাধারণত চুরি, ছিনতাই, সন্ত্রাস, খুন ও সংঘবদ্ধ অপরাধও বৃদ্ধি পায়। কারণ মাদক শুধু একজন ব্যক্তির শারীরিক ক্ষতি করে না, তার বিচার-বিবেচনা ও সামাজিক দায়িত্ববোধও দুর্বল করে দেয়। অনেক মাদকসেবী একসময় নিজের নেশার অর্থ জোগাড় করতে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে শক্তিশালী আর্থিক নেটওয়ার্ক, যার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ, প্রতিশোধমূলক হামলা এবং হত্যাকাণ্ড ঘটতে থাকে। বর্তমানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মাদক কারবার ঘিরে সহিংসতা বাড়ছে। শুধু মাদক ব্যবসায়ীরাই নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, তথ্যদাতা এবং মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সাধারণ মানুষও হামলার শিকার হচ্ছেন। অর্থাৎ মাদক এখন একটি সামাজিক সমস্যা থেকে নিরাপত্তা সমস্যায় রূপ নিয়েছে। এর অর্থ হলো, মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইকে কেবল একটি আইনগত অভিযান হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্ন হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার এবং অসংখ্য ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হলেও মূল প্রশ্ন রয়ে যায়, মাদকের সরবরাহ বন্ধ হচ্ছে কি? বাস্তবতা বলছে, গ্রেপ্তার হওয়া অনেকেই কিছুদিন পর আবার একই কর্মকাণ্ডে ফিরে আসছে। আরও বড় সমস্যা হলো, মাঠপর্যায়ের কারবারিদের ধরা গেলেও নেপথ্যের অর্থদাতা, চোরাকারবারি নেটওয়ার্ক এবং বড় নিয়ন্ত্রকদের অনেক সময় আইনের আওতায় আনা যায় না। ফলে অপরাধের মূল কাঠামো অক্ষত থেকে যায়। আমরা মনে করি, মাদক নিয়ন্ত্রণে বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, সমন্বিত কৌশল প্রয়োজন। সীমান্তে নজরদারি আরও শক্তিশালী করতে হবে, মাদক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে হবে এবং বড় কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ সমপ্রসারণ করাও জরুরি। কারণ চাহিদা কমানো ছাড়া শুধু সরবরাহ বন্ধ করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।