কৃষি প্রধান অঞ্চল হিসেবে পরিচিত রাজশাহীর তানোর উপজেলা। কৃষির উপর নির্ভরশীল জনসাধারন। ধান চাষে চলে সংসার। সেই ধানের দাম কমতে কমতে এবারে ৬০০ টাকা (২৮ কেজিতে মন) মনে বিক্রি হচ্ছে। চলতি আউশ মৌসুমে ধানের চাষাবাদ করে হতাশ হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। কোনভাবেই উঠছেনা উৎপাদন খরচ। আবার চাষাবাদের জন্য সব কিছুর বাড়তি দাম। ফলে নিরব দুর্ভিক্ষের মধ্যে দিন যাপন করছেন কৃষকরা। এলাকাবাসী সুত্রে জানা গেছে, তানোর পৌর এলাকার রহিমা ডাংগা নামক জায়গায় ১৫০ থেকে ২০০ বিঘার মত আউশ ধানের চাষাবাদ করেছেন ওই এলাকার কৃষকরা। অবশ্য প্রতি বছর আউশ ধানের চাষ করে থাকেন তারা। আউশ ধান কাটার পর আগাম আলু রোপন করেন চাষিরা। কিন্তু বিগত সময়ের চেয়ে এবারে ধানের দাম নেই বললেই চলে।
বরুজ গ্রামের তরুন কৃষক জুয়েল আক্ষেপ করে বলেন, চাষাবাদ আমাদের জীবনে অভিশপ্ত হয়ে পড়েছে। রহিমা ডাংগায় ৭ বিঘা জমিতে আউশ ধানের চাষাবাদ করেছিলাম। সেভেন ও ছিয়াত্তর জাতের ধান রোপন করি। ধান কাটা হয়েছে। কিন্তু দাম নেই। একটু কাঁচা ধান এজন্য কেউ নিতেই চাচ্ছে না। বস্তা ঠিকা বা ৬০০ টাকা মন ধান বিক্রি করতে হয়েছে। তিনি বলেন, বিঘায় ১৮ থেকে ১৯ মন ধান হয়েছে। মেশিনে কাটা মাড়ায় করা হয়েছে। রহিমা ডাংগায় বেশির ভাগ কৃষকরা লীজ নিয়ে আবাদ করে থাকেন। কারন তারাই আবার আলু চাষাবাদ করেন। এক বিঘা জমি ১২ হাজার টাকায় লীজ নিতে হয়। এক বিঘা জমি রোপন থেকে কাটার আগ পর্যন্ত ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা করে খরচ হয়েছে।
কাটা মাড়ায় ৪ হাজার টাকা। জমি থেকে রাস্তা, রাস্তা থেকে বাড়িতে আনতে বাড়তি ভাড়া। তেলের দাম বাড়তির কারনে ভাড়া হয়েছে দ্বিগুণ। বিঘায় খরচ ১৪ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা। বিঘায় ১৮ মন ধানের ৬ শত টাকা মন হলে ১০ হাজার ৮০০ টাকা দাম আসে। লোকসান ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা। লীজের টাকা ধরা হলে বিঘায় ১৬ হাজার থেকে ১৭ হাজার টাকা করে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এভাবে আর কত লোকসান গোনা যায়। এক মৌসুমের লোকসান দূর করতে কয়েক মৌসুম চাষ করা লাগে। জয়নাল নামের কৃষক ৫ বিঘা ও সবুজ নামের কৃষকের ৯ বিঘা, ভবেশ ৫ বিঘা, মইনুল সাড়ে ৫ বিঘা রহিমা ডাংগার জমিতে আউশ ধানের চাষ করে লোকসান গুনছেন।
তারা জানান, ধান চাষের জন্য সার কীটনাশকের বাড়তি দাম। অথচ ধানের দাম ৬০০ টাকা মন। যা বিগত সময়ে কখনো এমন দাম হয়নি। প্রতিটি জিনিসের দাম বাড়তি হলেও দিনের দিন ধানের দাম কমে যাচ্ছে। আবার ধান কাটার সময় সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে দেয়া হয়। কৃষকরা জানান, এ উপজেলা কৃষি প্রধান হিসেবে ধরা হয়। কৃষি চাষাবাদে চলে সংসার ও জীবন জীবিকা। সেই কৃষিতে আজ ধস নেমেছে। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধানের আবাদ হয় এ উপজেলাতে। বর্তমানে রোপা আমন ধান মাঠে বিরাজো মান। প্রায় সাড়ে ২২ হাজার হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষ হয়েছে। কিন্তু ধানের দাম না থাকার কারনে চাষীদের ঘরেঘরে এক প্রকার দুর্ভীক্ষ বিরাজোমান। সবচেয়ে বেশি কষ্টে দিন যাপন করছে নিম্ম ও নিম্ম মধ্যবৃত্ত কৃষকরা।
তারা না পারছে চাইতে না পারছে সইতে। কারন ধানে তাদের সারা বছরের খোরাক জোগায়। সেই ধানের এঅবস্থা। আশি নব্বই দশকে শোনা যেতে কার্তিক মাস মানে চরম অভাব অনাটন আর ঘরেঘরে দূর্ভীক্ষ। বর্তমানে কয়েক বছর ধরে সেই কার্তিক মাসের দূর্ভীক্ষ আর অভাব অনাটনে পড়েছে কৃষকরা। তবে, চরম কষ্টে কৃষকরা দিন পার করলেও চাকুরীজীবিদের বেতন বাড়তেই আছে। একদিকে কৃষক মরছে অন্যদিকে চাকুরীজীবিরা আরামে দিন যাপন করছেন। অথচ এই পা ফাটা কৃষকরা দেশকে খাদ্যেস্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলেছেন। কৃষকরা চাষাবাদ করে বলেই তো খাবার পাওয়া যাচ্ছে। আর সেই খাদ্য যোদ্ধারা খাদ্যভাবে দিন কাটাচ্ছে। অথচ কৃষি পণ্যের দাম নির্ধারণ করার দায়িত্ব কৃষি বিপণন বিভাগের। কিন্তু তারা উদাসীন।
তানোর উপজেলা কৃষি অফিসার সাইফুল্লাহ আহমেদ জানান, কৃষি পণ্যের দাম নির্ধারণ করে কৃষি বিপণন বিভাগ। আর কৃষি দপ্তর চাষাবাদ কিভাবে হবে, কিভাবে রোগবালা দূর হবে এসব নিয়ে কাজ করা হয়। কৃষি পন্যের দাম নিয়ে তাদের কিছুই করার নেই। এবছর তানোর উপজেলায় ৮ হাজার ৫শ' ৭৫ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের চাষ হয়েছে বলেও জানান তিনি।