দেশে বিপুল কয়লা মজুদ থাকলেও উত্তোলনে বাঁধা সামাজিক প্রেক্ষাপট

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ২ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৩৬ এএম
দেশে বিপুল কয়লা মজুদ থাকলেও উত্তোলনে বাঁধা সামাজিক প্রেক্ষাপট

দেশে বিপুল পরিমাণ কয়লা মজুদ থাকলেও উত্তোলনে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সামাজিক প্রেক্ষাপট। অথচ দেশের ৫টি কয়লা ক্ষেত্র ও খনিতে মজুদ কয়লার ২০ শতাংশ উত্তোলন করলেই মিলতে পারে ১ হাজার ৫৬৪ মিলিয়ন টন কয়লা। যা পূরণ করবে প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা। বর্তমানে একমাত্র বড়পুকুরিয়া খনি থেকে পেট্রোবাংলা কয়লা উত্তোলন করছে। এখনো ওই খনিতে ৩৯০ মিলিয়ন টন কয়লা মজুদ রয়েছে। বড়পুকুরিয়া খনি থেকে প্রতি বছর সর্বোচ্চ সাড়ে ৯ লাখ টনের মতো কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে। তবে জয়পুরহাটের জামালগঞ্জে দেশের সবচেয়ে বেশি গভীরতার কয়লাক্ষেত্র অবস্থিত। ওই খনিতে ৫ হাজার ৪৫০ মিলিয়ন টনের কয়লা মজুদ আছে। আর নতুন সমীক্ষা অনুযায়ী ওই কয়লাক্ষেত্রে কয়লার মজুত আগের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়ে প্রায় ৫৫০ কোটি টন দাঁড়িয়েছে। আগে তা ছিল ১০০ কোটি টন। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সরকারকে উচ্চমূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি তেল আমদানিতে বেগ পেতে হচ্ছে। পাশাপাশি দ্রুত কমে আসছে দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদও। এ অবস্থায় সরকার বিকল্প জ্বালানি হিসেবে নিজস্ব খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের ওপর জোর দিচ্ছে। জ্বালানিসংকটের এই কঠিন সময়ে সরকার দেশি কয়লার ওপর ভরসা রাখতে চাচ্ছে। কিন্তু কয়লা উত্তোলনে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে সামাজিক বাঁধা। পেট্রোবাংলা সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সামাজিক চাপ ও বাঁধার কারণেই দেশের খনিগুলো থেকে কয়লা উত্তোলন ব্যাহত হচ্ছে। তবে স্থানীয় ও সামাজিক চাপ উন্নতি হলেই এগিয়ে নেয়া হবে ফুলবাড়ীর কয়লা উত্তোলন কার্যক্রম। আগেই ওই কয়লাক্ষেত্র নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে। সব ঠিক থাকলে কয়লা উত্তোলনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। তাছাড়া বড়পুকুরিয়াতে নতুন করে আরো ৩০০ একর জায়গায় কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে মোটামুটি সম্মত হয়েছে স্থানীয়রা। সেখানে বোর হোল করতে হবে। তবে রংপুরের খালাশপীরের বিষয়ে পরিকল্পনা থাকলেও এখন পর্যন্ত অগ্রগতি নেই। বর্তমানে ফুলবাড়ী ও বড়পুকুরিয়ায় নতুন ৩০০ একর জায়গা নিয়ে মূল পরিকল্পনা। তাছাড়া জামালগঞ্জেও কয়লা রয়েছে। কিন্তু সেখানেও সামাজিক বাঁধাই মূল সমস্যা।

সূত্র জানায়, দেশের কয়লা উত্তোলন ও ব্যবহারে যাতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে সেদিকে লক্ষ্য রাখা জরুরি। একই সঙ্গে  জ্বালানি আমদানি নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে নিজস্ব কয়লা উত্তোলন বাড়াতে হবে। সেজন্যই বর্তমান সরকার জ্বালানিসংকট সমাধানে কয়লা উত্তোলনে জোর দিচ্ছে। তবে ইতিপূর্বে বছরের পর বছর সময় কেটে গেছে দেশের কয়লা উত্তোলনে ভূগর্ভস্থ ও উন্মুক্ত পদ্ধতি নিয়ে তর্কেই। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। আবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও কয়লা উত্তোলন নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসেনি। যদিও বর্তমানে দেশে প্রায় ৮ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। ওসব কেন্দ্রগুলো চালাতে সরকারকে প্রতিবছর আমদানি করতে হয় হাজার হাজার কোটি টাকার কয়লা। বর্তমান সরকার দেশের নিজস্ব কয়লা উত্তোলনের বিষয়টিতে জোর দিয়েছে। 

এদিকে জামালগঞ্জের ভূগর্ভের প্রায় ৬৪০ থেকে ১ হাজার ১৫৮ মিটার গভীরে রয়েছে কয়লা। ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতে খনি নির্মাণ করে কয়লা তুলতে বহুগুণ বেড়ে যায় উৎপাদন ব্যয় এবং প্রযুক্তিগত ঝুঁকি। সেক্ষেত্রে আন্ডারগ্রাউন্ড কোল গ্যাসিফিকেশন বা ইউসিজি পদ্ধতিতে কয়লা সরাসরি ওপরে না তুলে খনির ভিতরেই নিয়ন্ত্রিত উপায়ে তাকে গ্যাসে রূপান্তর করা হয়। জামালগঞ্জের ইউসিজি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা আছে। তাছাড়া অন্য তিনটি কয়লা ক্ষেত্রের মধ্যে দিনাজপুরের দীঘিপাড়ায় আছে ৮৬৫ টন কয়লা। সেটির উন্নয়নকাজ ২০১৮ সালে শুরু হয়। বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির তত্ত্বাবধানে জার্মানির দুটি ও অস্ট্রেলিয়ার একটি কোম্পানির সমন্বয়ে একটি কনসোর্টিয়াম খনি এলাকার সম্ভাব্যতা যাছাই করেছে। ওই পরিপেক্ষিতে দীঘিপাড়া খনি থেকে ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে কয়লা তোলার সিদ্ধান্ত হয়। তাছাড়া রংপুরের খালাশপীরে ৬৮৫ মিলিয়ন টন কয়লা মজুদ আছে। 

অন্যদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের খনিগুলো থেকে কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। আমদানি নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসতে বাড়াতেই হবে নিজস্ব উৎপাদন ও প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ। আর দেশে খনিজসম্পদ থাকলে তা ব্যবহার করাই উচিত। কিন্তু কয়লা এমনভাবে উত্তোলন ও ব্যবহার করতে হবে যাতে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনন করলে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে। এখানে ভূগর্ভস্থ খনি করতে হবে। কারণ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সমতল ও উর্বর ভূমি অত্যন্ত ঘন। এখানে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি ব্যবহারিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। সেজন্য রিকভারি কম হলেও ভূগর্ভস্থ পদ্ধতি কয়লা উত্তোলনে যেতে হবে।

এ বিষয়ে জাতীয় সংসদে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, খালাশপীর কয়লাক্ষেত্র থেকে কয়লা উত্তোলনে পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আর ফুলবাড়ীতে মজুত আছে ৫৭২ মিলিয়ন টন কয়লা। ওই খনি থেকে ৪৭২ মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলন করা যাবে। আর বছরে ওই খনি থেকে ১৫ মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলন করা যাবে। অথচ দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য বছরে ২০ মিলিয়ন টন কয়লা আমদানি হয়। আর শুধু ফুলবাড়ীর কয়লা দিয়েই দেশের কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ৭৫ শতাংশ চাহিদা মেটানো যাবে।