দীর্ঘদিনের নাব্যতা সংকট, জলাবদ্ধতা ও পানি নিষ্কাশন সমস্যার অবসানে ময়মনসিংহের ত্রিশালে সুতিয়া নদী পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার লক্ষ্যে ৪৪ কোটি ১০ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে সুতিয়া নদীর প্রবাহ পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ ড্রেজিং প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৯৮ কিলোমিটার নদীপথে ৪৫ লাখ ঘনমিটার মাটি খনন করার পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় যে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, খননের মাধ্যমে সেই নাব্যতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সুতিয়া ময়মনসিংহ সদর, ত্রিশাল ও গফরগাঁও উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৮ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ ৬১ মিটার। নদীটি পুরাতন ব্রহ্মপুত্র থেকে বের হয়ে গফরগাঁও এলাকায় বানার নদীতে গিয়ে মিলিত হয়েছে। তবে নদীটি মৌসুমি হওয়ায় বছরের দীর্ঘ সময় পানিপ্রবাহ কম থাকে এবং পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের পলি জমা, নদীর বিভিন্ন অংশ সংকুচিত হয়ে যাওয়া এবং কোথাও কোথাও দখলের কারণে সুতিয়ার স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, মৎস্য ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায়। অতীতে ত্রিশালে সুতিয়া নদীর বিভিন্ন অংশ দখল ও ভরাটের অভিযোগও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। কমতে পারে জলাবদ্ধতা, বাড়বে কৃষির সম্ভাবনা সুতিয়া নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধার হলে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। ফলে নদীসংলগ্ন এলাকার জলাবদ্ধতা কমার পাশাপাশি কৃষিজমিতে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার ক্ষতি থেকেও কৃষকরা সুরক্ষা পেতে পারেন।
অন্যদিকে নদীতে পানির ধারণক্ষমতা ও প্রবাহ বাড়লে শুষ্ক মৌসুমে সেচের সম্ভাবনাও বাড়বে। এতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্রের উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সুতিয়া নদীর সঙ্গে যুক্ত এলাকায় ইতোমধ্যে কৃষিকাজে নদীর পানি ব্যবহারের বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে। নদী ফিরে পেলে ফিরতে পারে প্রাণ-প্রকৃতিও একসময় সুতিয়া নদী ত্রিশালের জনজীবন ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। নদীপথে পণ্য পরিবহন, মাছ ধরা এবং দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজে নদীর ওপর নির্ভরতা ছিল স্থানীয় মানুষের। সময়ের সঙ্গে নাব্যতা কমে যাওয়ায় সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু খনন করলেই নদীর দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত হবে না। খননের পর নদীর সীমানা সংরক্ষণ, দখল-দূষণ বন্ধ, খননকৃত মাটি যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও জরুরি। এতে প্রকল্পের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
সুতিয়া নদীর প্রবাহ পুনরুদ্ধারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ত্রিশালের কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ ও জনজীবনে এর বহুমাত্রিক প্রভাব পড়তে পারে। স্থানীয় কৃষক, মৎস্যজীবী, ব্যবসায়ীসহ নদী তীরবর্তী সাধারণ মানুষ সরাসরি উপকৃত হওয়ার প্রত্যাশা করছেন।
ময়মনসিংহ-৭ ত্রিশাল আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ডা. মাহবুবর রহমান লিটন বলেন, নদী বাঁচলে, ত্রিশাল বাঁচবে।ত্রিশালের দীর্ঘদিনের নদী রক্ষা, জলাবদ্ধতা নিরসনে সুতিয়া নদীর ক্যাপিটাল ও সংরক্ষণ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নিয়েছে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আমি ডিও লেটার প্রদান করেছিলাম। তা অনুমোদন হওয়ায় সুতিয়া নদী ফিরে পাবে তার নব্যতা। পাশাপাশি কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ ও জনজীবনে এর বহুমাত্রিক প্রভাব পরবে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে এনে জলাবদ্ধতামুক্ত, কৃষি ও পরিবেশবান্ধব ত্রিশাল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রকল্পটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।