জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের নিউইয়র্ক সফর বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থকে সমুন্নত করেছে। এই সফর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার পাশাপাশি অংশীদারিত্ব, বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের করবী হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘ সফর পরবর্তী বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে তিনি এ কথা জানান।
সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন জানান, চার দিনের এই সংক্ষিপ্ত অথচ নিবিড় সফরে প্রধানমন্ত্রী মোট ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনে ভাষণের পাশাপাশি তিনি ১১টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন এবং ৬টি গুরুত্বপূর্ণ সংলাপে বক্তব্য প্রদান করেন। এ ছাড়া সফরসঙ্গী হিসেবে থাকা ৩৫ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক ধারাবাহিকতায় প্রায় ৫০টি বৈঠকে অংশ নেন। ফলে পুরো সফরজুড়ে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকারী দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বৈঠকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮০টিরও বেশি। পাশাপাশি প্রযুক্তিক খাত ও আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতার নতুন পথ তৈরিতে একটি বিশেষ দল ক্যালিফোর্নিয়া সফর করে।
বিশ্বমঞ্চে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের রূপরেখা
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, বাকস্বাধীনতা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মতো জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো তুলে ধরেন। সরকারের ‘থ্রি-আর’ (রিকভারি, রিস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনশক্তাকশন) কৌশল ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার কার্ড, হেলথ কার্ড ও প্রস্তাবিত ইউনিভার্সাল কার্ড চালুর কল্যাণমুখী রূপরেখা বিশ্বনেতাদের সামনে উপস্থাপন করেন তিনি।
জলবায়ু ও স্বাস্থ্য খাত: বিশাল কর্ম পরিকল্পনা
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, তিস্তা মাস্টারপ্ল্যান ও পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়ন এবং সৌর ও নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারের বিশাল পরিকল্পনা তুলে ধরেন। পাশাপাশি জলবায়ু তহবিলের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে উন্নত বিশ্বের প্রতি জোর দাবি জানান।
স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশ ও গাম্বিয়া আয়োজিত যৌথ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের যুগান্তকারী পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন, যার মধ্যে ৮০ শতাংশই হবেন নারী।
রোহিঙ্গা সংকটে পাঁচ দফা প্রস্তাব রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী পাঁচ দফা রূপরেখা প্রস্তাব করেন, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও দ্বিপাক্ষিক অর্জন কূটনৈতিক তৎপরতায় মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে জনশক্তি রপ্তানি, বাণিজ্য বৃদ্ধি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা প্রাধান্য পায়। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে বৈঠকে তিনি সাম্প্রতিক নির্বাচনী জয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান এবং শান্তিরক্ষা ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
অর্থনৈতিক অঙ্গনে সফরটি বিশেষ সাফল্য এনেছে। ওয়াল স্ট্রিটের ২৫ জনেরও বেশি শীর্ষ বিনিয়োগকারী বাংলাদেশের আর্থিক খাতে বিনিয়োগ ও নতুন বন্ড চালু করার আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা এবং ১১টি উড়োজাহাজ কেনাকাটার চুক্তির বিষয়ে বোয়িং প্রতিনিধিদের সঙ্গেও ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
উল্লেখ্য, সফরকালে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ড. জুবাইদা রহমানও ৮টি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নেন। তিনি ইউএস ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের সংবর্ধনা ও উইমেন লিডার্স প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেন। সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এএএম সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, স্পিচ রাইটার মাহফুজুর রহমানসহ অন্যান্য উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।