দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল বকেয়া বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে। বিশাল ওই আর্থিক দায় এখন সরকারের উপর। বর্তমানে সরকারকে মাতারবাড়ী ও পটুয়াখালীর দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ট্যারিফ ঘাটতি ও বকেয়া মেটাতে হবে। তাতে সরকারকে বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হবে। ওই আর্থিক চাপের অন্যতম বড় কারণ অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ প্রায় ৫২ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা য়োর প্রক্ষেপণ রয়েছে। এ খাতে চলতি বছর ভর্তুকির চাহিদা ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। কারণ গড়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে প্রায় ১২ টাকা ৯৭ পয়সা খরচ হলেও বিক্রয়মূল্য প্রায় ৭ টাকা। মূল্য ব্যবধানের ওই টাকা ভর্তুকি হিসাবে আসে। বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
গংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, পটুয়াখালী কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের (১৩২০ মেগাওয়াট) প্রথম ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন বিগত ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর এবং দ্বিতীয় ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন বছরের মে থেকে হিসাব করা হয়েছে। আর মাতারবাড়ী আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের (১৩২০ মেগাওয়াট) ইউনিটগুলোর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ার পর থেকেই ট্যারিফ ঘাটতির হিসাব করা হয়। ফলে কেন্দ্রগুলো উৎপাদনে এলেও বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) অনুযায়ী প্রকৃত ক্রয়মূল্য এবং গ্রাহক পর্যায়ে বিক্রয়মূল্যের মধ্যে যে বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে, তা সরকারি ভর্তুকির মাধ্যমেই মেটাতে হচ্ছে।
সূত্র জানায়, শুধু মাতারবাড়ী কেন্দ্রেরই প্রায় ৪ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা বকেয়া পড়েছে। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখা, ক্যাপাসিটি চার্জ মেটানো এবং বিদেশি ঋণের কিস্তির চাপ সামলাতে বকেয়া অর্থ দ্রুত ছাড় করার অনুরোধ জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। তাছাড়া শুধু বকেয়া ভর্তুকি পরিশোধ করেই হবে না সমস্যার স্থায়ী সমাধান। সেজন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন, ক্রয়, ক্যাপাসিটি চার্জ, জ্বালানি ব্যয় ও গ্রাহক পর্যায়ের ট্যারিফ-সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। না হলে এক কেন্দ্রের বকেয়া পরিশোধের পর আরেক কেন্দ্রের ট্যারিফ ঘাটতি তৈরি হবে। তখন ভর্তুকির চাপ কমার বদলে প্রতিবছরই বাড়ার শঙ্কা থাকে। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়লেও ওই বিদ্যুৎ কিনতে গিয়ে সরকারের আর্থিক না কমে বরং বেড়েই চলেছে। আর ট্যারিফ ঘাটতির মধ্যে দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মূলত সরকারি-বেসরকারি কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে কম দামে। ফলে ক্রয়-বিক্রয় মূল্যের ব্যবধান পূরণে সরকারকে দিতে হচ্ছে বিপুল ভর্তুকি।
সূত্র আরো জানায়, পটুয়াখালীর ১৩২০ মেগাওয়াট প্রকল্প নিয়ে একটি বড় আর্থিক দায়ের বিষয়ও উঠে এসেছে। চীনের এক্সিম ব্যাংকের নেতৃত্বাধীন ঋণ সিন্ডিকেট থেকে প্রকল্পের জন্য অর্থ নেয়া হয়েছে। যার ৫০ শতাংশের জন্য বাংলাদেশ সরকার সার্বভৌম (সভরেন) গ্যারান্টি দিয়েছে। ইতোমধ্যে ঋণের প্রথম কিস্তির আসল ও সুদ পরিশোধ করা হলেও পরবর্তী কিস্তির ১৩৬.১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধের দায় প্রায় হাজির। ফলে কেন্দ্র চালু রাখার খরচের পাশাপাশি বিদেশি ঋণের দায়ও সরকারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে। ইতিমধ্যে বিল পরিশোধে বিলম্ব হলে কেন্দ্রটির পরিচালনা ও জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
এদিকে এ বিষয়ে বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ জানান, বিশেষ আইন বাতিল হলেও ওই আইনের অধীনে আগে করা চুক্তিগুলো কার্যকর থাকবে এবং সেই চুক্তি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে সমপ্রতি বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়টি পর্যালোচনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আগের সরকারের রেখে যাওয়া বকেয়া পরিশোধের পাশাপাশি নতুন দায়ও সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। তবে কোনোভাবেই উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয়ের অতিরিক্ত ব্যয় সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপানো হবে না।