জামায়াতকে দল হিসেবে ‘অকৃতজ্ঞ’ বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তাঁর দাবি, ২০০১ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জামায়াতের দুই নেতাকে মন্ত্রী করেছিলেন এবং এর মাধ্যমে তাদের ‘রাজাকারের তকমা’ দূর করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু জামায়াত এখন সেই বিষয়টি ভুলে গেছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনে আর্থিক সহায়তার চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মীর শাহে আলম বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের সরকার এবং দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে নির্বাচিত। তাঁর অভিযোগ, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস না যেতেই বিরোধীরা লংমার্চ করে সরকার পতনের হুমকি দিচ্ছে।
আগামী বছরের জানুয়ারিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী দলের নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে। স্থানীয় ও উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি একক প্রার্থীকে সমর্থন দেবে। যারা এর বিরোধিতা করবেন বা বিদ্রোহী প্রার্থী হবেন, তাদের বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এনসিপি ও জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের পুরোনো সম্পর্ক রয়েছে বলেও দাবি করেন মীর শাহে আলম। তাঁর ভাষ্য, ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ থাকতে পারে এবং পুরোনো সম্পর্ক আবারও জোড়া লাগতে পারে। বর্তমানে দেশে তারা যে আন্দোলন করছে, তা আওয়ামী লীগকে সহায়তা করার শামিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এটি প্রতিমন্ত্রীর রাজনৈতিক দাবি, যার পক্ষে তিনি অনুষ্ঠানে কোনো বিস্তারিত প্রমাণ তুলে ধরেননি।
১১ দলীয় জোটের নেতাদেরও সমালোচনা করেন মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, তারা সংসদে এক ধরনের কথা বললেও বাইরে অন্য কথা বলেন। তাঁর অভিযোগ, তারা নানা ধরনের ‘অভিনয়’ করছেন। এনসিপির নেতাদের বয়স কম উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা সম্মান দিয়ে রাজনৈতিক ভাষায় কথা বলেন না এবং তারেক রহমানকে নিয়ে ‘বিশ্রী ভাষায়’ কথা বলেন।
বিএনপি কোনো হুমকিকে পরোয়া করে না বলেও মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, গত নির্বাচনে যারা বিএনপির সঙ্গে ‘বেঈমানি’ করেছে, তাদের দলে আর জায়গা হবে না।
দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে মীর শাহে আলম বলেন, যারা দলের দুঃসময়ে কাজ করেছেন, তাদের পর্যায়ক্রমে মূল্যায়ন করা হবে। আইন ও নিয়মের মধ্যে থেকে চাকরি, বৈধ ডিলারশিপ, ঠিকাদারিসহ বিভিন্ন বৈধ সুযোগ দেওয়া হবে।
পাঁচ বছর পর কাজের হিসাব দেওয়ার কথা
অনুষ্ঠানে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বেহেশতের লোভ দেখিয়ে নয়, বিদ্যুৎ ও গ্যাস, রাস্তাঘাট, শিক্ষা, খেলাধুলাসহ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেই পাঁচ বছর পর জনগণের কাছে আবার ভোট চাইবে বিএনপি।
মীর শাহে আলম বলেন, সরকারের মেয়াদ এখনো অল্প সময়ের। বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ বিভিন্ন খাতে পরিবর্তন আনতে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাঁচ বছর পর জনগণের কাছে গিয়ে সরকারের কাজের হিসাব দেওয়া হবে।
বাঁশখালীর উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আনোয়ারা-বাঁশখালী-চকরিয়া সড়ক ৩৪ ফুট প্রশস্ত করার টেন্ডার হয়ে গেছে। কয়েকশ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটির কাজ আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। বাঁশখালীর আরও যেসব রাস্তা সংস্কার বা নির্মাণ প্রয়োজন, সেগুলোর তালিকা দিলে মন্ত্রণালয়ের আওতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন নিয়েও কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক আকস্মিক ভারী বর্ষণ ও বন্যায় বাঁশখালী, চন্দনাইশ ও সাতকানিয়ার মানুষ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন ও সরকার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি সহায়তায় কোনো ত্রুটি হয়ে থাকলে জনগণের কাছে ক্ষমা চান তিনি। বন্যার সময় ত্রাণের সংকট দেখা দিলে জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে বরাদ্দ এনে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান।
মীর শাহে আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশেই তিনি বাঁশখালীতে এসেছেন। বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৫১০ পরিবার পেল ৩০ হাজার টাকা করে
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, গত জুলাইয়ের ভয়াবহ বন্যায় চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও সাতকানিয়া উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাঁশখালীতে প্রায় ১২ হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের উদ্যোগে বৃহস্পতিবার ৫১০টি পরিবারকে ঘর নির্মাণের জন্য ৩০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহাবুবের রহমান শামীম। তিনি বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনে জেলা পরিষদ শুরু থেকেই কাজ করছে। বন্যার সময় দুর্গত এলাকায় জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ত্রাণও বিতরণ করা হয়েছে।
তিনি জানান, প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে জেলা পরিষদ পাশে থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবারের কার্যক্রম সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা। বাঁশখালীর ৫১০ পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার পর পর্যায়ক্রমে চট্টগ্রামের আরও ৫৯০ পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
মাহাবুবের রহমান শামীম একই সঙ্গে তারেক রহমানকে নিয়ে ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান এবং তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ একটি সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার ইখতেখার উদ্দীন আরফাতের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম-১২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হক, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ জকরিয়া, স্থানীয় সরকার চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক মনোয়ারা বেগম, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. ইদ্রিস মিয়া এবং চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী রওশন ইসলাম।