সাত মাসে নিখোঁজের পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার, চলতি মাসেই নিখোঁজ ৪৬, সন্ধান নেই ৩১ জনের | পারিবারিক বিরোধ থেকে পাচার, মাদক ও ভিক্ষাবৃত্তির চক্রের আশঙ্কা | জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরির তাগিদ
সন্তান কোথায়, কেমন আছে, আদৌ ফিরবে কি না, এই উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে দেশের বহু পরিবারের। শিশু নিখোঁজের ঘটনায় উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে সরকারি ও মানবাধিকার সংগঠনের তথ্যেও। পুলিশ সদরদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজের ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার বা পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হলেও এখনো সন্ধান মেলেনি ২ হাজার ৩৮ জনের। এরই মধ্যে জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিখোঁজ হওয়ার পর অন্তত ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
চলতি সেপ্টেম্বরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মুন অ্যালার্টের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে সারাদেশে ৪৬ শিশু নিখোঁজ হয়েছে। এর মধ্যে ১১ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে এবং চারজনের মরদেহ পাওয়া গেছে। এখনো খোঁজ নেই ৩১ জনের।
শিশু নিখোঁজের এই দীর্ঘ তালিকার প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের অসহায় অপেক্ষা। রাজধানীতে ১২ বছরের হাবিবুল্লাহ নাঈমের পরিবারও এখন সেই অপেক্ষায়। ১৭ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুর্মিটোলা স্কুলের সামনের বাসা থেকে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে টিউশনিতে বের হয়েছিল নাঈম। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি। আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ করেও সন্ধান না পেয়ে র্যাব ও খিলক্ষেত থানায় হারানোর ডায়েরি করেছে পরিবার।
নাঈমের মা বলেন, ‘একটাই রিকোয়েস্ট আপনাদের মাধ্যমে আমার বাচ্চাটা যেন ফিরে আসে, আপনারা এতটুকু আমাকে হেল্প করেন।’
নাঈম একা নয়। গত ২৮ আগস্ট রাজধানীর বনানীর সৈনিক ক্লাব এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় চার বছর বয়সী আফরুজ্জাহান সাইবা। এখনো তার সন্ধান মেলেনি। গত ১৫ সেপ্টেম্বর তেজগাঁওয়ের বিটাক ট্রেনিং সেন্টার থেকে নিখোঁজ হয় ১৭ বছরের কিশোর কাওসার হোসেন নিলয়। এক সপ্তাহ ধরে খুঁজেও তাকে পায়নি পরিবার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী ৪৭৪ শিশু নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ৪০৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, এখনো সন্ধান নেই ৬৮ জনের।
১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা ১৫ হাজার ২৪৩। এর মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, ১ হাজার ৯৭০ জন এখনো নিখোঁজ।
পুলিশের ব্যাখ্যায়, ছোট শিশুদের অনেকেই পরিবারের সঙ্গে অপরিচিত জায়গায় গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলে। কেউ নিজের নাম-ঠিকানা বলতে না পারায় পরিবারের কাছে ফিরতে পারে না। আবার কেউ একা বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরতে পারে না।
বয়স বাড়ার সঙ্গে নিখোঁজ হওয়ার কারণও বদলায় বলে জানিয়েছে পুলিশ। ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়া, পড়াশোনার চাপ, অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার পর আত্মগোপন, স্বাধীনভাবে থাকার চেষ্টা, পরিবারের কাছ থেকে টাকা বা অন্য সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা, পারিবারিক বিরোধ এবং বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাবের মতো কারণ রয়েছে।
পুলিশ সদরদপ্তর জানিয়েছে, অনলাইন জিডি চালুর পর নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে সাধারণ ডায়েরির সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৩ সালে নিখোঁজ-সংক্রান্ত জিডি হয়েছিল ১৭ হাজার ৮০৮টি। ২০২৪ সালে তা ছিল ১৬ হাজার ৪১৪ এবং ২০২৫ সালে ২২ হাজার ৫৫০টি।
নিখোঁজ হওয়ার পর শিশুদের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করছে। আসকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় ২৫৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আসক।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান বলেছেন, কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তার মরদেহ উদ্ধারকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা উচিত নয়। কীভাবে শিশুটি নিখোঁজ হলো, তাকে উদ্ধারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, কোথাও দায়িত্বে অবহেলা বা সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল কি না এবং অপরাধে কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অপ্রতিমসহ নিখোঁজ হয়ে পরে মৃত পাওয়া শিশুদের ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি। উদ্ধার তৎপরতায় কোনো ধরনের অবহেলা থাকলে তারও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
শিশু নিখোঁজের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব ঘটনা একই কারণে ঘটছে না। কিছু শিশু পারিবারিক বিরোধ, অতিরিক্ত শাসন বা অভিমান থেকে বাড়ি ছেড়ে যেতে পারে। তবে বিপুলসংখ্যক শিশুর নিখোঁজ হওয়ার পেছনে আরও বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু শ্রমের চক্র, ভিক্ষাবৃত্তির সিন্ডিকেট, মাদক সংশ্লিষ্ট চক্র এবং পাচারকারীরা শিশুদের ব্যবহার করতে পারে। জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করা, ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার কিংবা মাদক বহনের মতো অপরাধেও শিশুদের ব্যবহারের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, ‘যেখানে শিশুদের সুরক্ষা করার কথা, সেখানে সুরক্ষার পরিবর্তে যখন আমরা দেখব সে ভিকটিম হচ্ছে, মার্ডারের শিকার হচ্ছে এবং সে নিখোঁজ হচ্ছে, এটা আসলে আমাদের চিন্তা করার মতো বিষয়।’
তিনি বলেন, শিশুদের জোরপূর্বক শ্রমে ব্যবহার, ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানো এবং বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহার করার জন্য কোনো কোনো চক্র তাদের কাজে লাগাতে পারে। এমনকি মাদক বহনের ক্ষেত্রেও শিশুদের ব্যবহার করার আশঙ্কার কথা জানান তিনি।
শিশু নিখোঁজের ঘটনায় কোনো নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট বা চক্রের তথ্য নেই বলে জানিয়েছে পুলিশ। ক্রাইম ম্যানেজমেন্টের ডিআইজি মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান বলেন, নিখোঁজের ঘটনা বিভিন্ন কারণে ঘটছে।
তিনি বলেন, ‘সেরকম কিছু না, এগুলো বিভিন্ন কারণে হচ্ছে। বিভিন্ন কারণে কেউ হয়তো রাগ করে বের হয়ে গেছে, এগুলো সংখ্যা খুব বেশি না। এগুলা হয়তো নিখোঁজ জিডি করল, তো দু-এক দিন পর আবার সে বাসায় চলে আসছে, ফেরত আসছে এরকম।’
নিখোঁজের ঘটনায় দ্রুত অনুসন্ধানের নির্দেশনা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, থানায় জিডি হওয়ার পর দ্রুত অনুসন্ধান করে নিখোঁজ ব্যক্তির খোঁজ নেওয়া এবং তাকে খুঁজে পাওয়ার ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।
শিশু নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ সদরদপ্তর জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজের তথ্য দিয়েছে। অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর হিউম্যান রাইটসের (ISHR) এক প্রতিবেদনে একই সময়ে ১৫ হাজার ৯১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ISHR-এর প্রতিবেদনে মাসভিত্তিক তথ্যেও অসামঞ্জস্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং জাতীয় নীতি ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্য নির্ভুল তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
তথ্যের এই পার্থক্যই শিশু নিখোঁজের বিষয়ে একটি সমন্বিত ও নিয়মিত হালনাগাদ জাতীয় তথ্যভান্ডারের প্রয়োজনীয়তা সামনে আনছে।
আসকও নিখোঁজ শিশুদের জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় ডাটাবেস তৈরির দাবি জানিয়েছে। সেখানে নিখোঁজ, উদ্ধার এবং এখনো সন্ধান না পাওয়া শিশুদের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করার পাশাপাশি কোন ধরনের ঝুঁকিতে শিশুরা বেশি পড়ছে, তা শনাক্ত করার ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া গেলে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য নেওয়া, সম্ভাব্য যাতায়াতের পথ শনাক্ত করা এবং আশপাশের থানা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সতর্ক করা সম্ভব।
শিশু নিখোঁজের পর সময় যত গড়ায়, তাকে অন্য এলাকা বা জেলার দিকে সরিয়ে নেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তাই নিখোঁজের প্রতিটি ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালানোর ওপর জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
১৫ হাজার ৭১৭, ২ হাজার ৩৮, ৪৬ কিংবা ৩১, পরিসংখ্যানের এই সংখ্যাগুলোর প্রতিটির পেছনে রয়েছে একটি শিশু এবং একটি পরিবার। একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিবারের স্বাভাবিক জীবনও থমকে যায়।
কেউ থানায়, কেউ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দপ্তরে, কেউ হাসপাতাল বা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে সন্তানকে খুঁজে বেড়ান। দিনের পর দিন কোনো খবর না পেয়ে বাড়তে থাকে উৎকণ্ঠা।
নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধার হওয়া ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে ঝুঁকির ধরন চিহ্নিত করা, নির্ভুল জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরি, পুলিশি তৎপরতা ও আন্তঃসংস্থার সমন্বয় বাড়ানো এবং জনসচেতনতা জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীরা।
কারণ একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রতিটি মুহূর্তই পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত ও সমন্বিত তৎপরতা একটি শিশুকে নিরাপদে ফিরিয়ে দিতে পারে তার পরিবারের কাছে।