ভারতসহ বিশ্বের সব রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মান, সমমর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে। ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রয়োজন হলেও একতরফা বা অসম সম্পর্ক বাংলাদেশ প্রত্যাশা করে না বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকালে ভোলা সার্কিট হাউসে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। ভোলায় সফর শেষে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে স্পিকার বলেন, দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ ও কথাবার্তা চলছে। বাংলাদেশ আশা করে, ভবিষ্যতে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও ভালো হবে। তবে সেটি হতে হবে দুই দেশের স্বার্থ, মর্যাদা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাকে গুরুত্ব দিয়ে।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “আমরা ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাই। তবে সেটি হতে হবে সমমর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে। দুটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যে যে ধরনের সম্পর্ক থাকা উচিত, বাংলাদেশ সে ধরনের সম্পর্কই চায়।”
ভারতের পক্ষ থেকে কাঙ্ক্ষিত সুসম্পর্কের বিষয়টি বর্তমানে দৃশ্যমান নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বিশেষ করে বাংলাদেশের সাবেক সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত আশ্রয় দিয়েছে এবং সেখানে বসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দিয়েছে, যা বাংলাদেশের কাছে প্রতিবেশীসুলভ আচরণ বলে মনে হয়নি বলে জানান স্পিকার।
ব্রিকস প্রসঙ্গেও কথা বলেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখনো ব্রিকসের সদস্য নয়। অংশীদার হওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা থাকলেও এ বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট নীতি প্রকাশ্যে জানানো হয়নি। আগের সরকারও ব্রিকসে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করেছিল বলে জানান তিনি।
স্পিকারের ভাষ্য, ব্রিকসে অংশগ্রহণের বিষয়ে ভারত থেকে তেমন উৎসাহ দেখা যায়নি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন স্পিকার। তিনি বলেন, একটি অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আগের সরকারের বিদায় হয়েছে। এরপর প্রায় দুই বছর অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ বিএনপিকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়েছে। নতুন সরকারের বয়স এখনো সাত মাস।
দীর্ঘ সময়ের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে উল্লেখ করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, গত ১৭ বছরের শাসনামলে দেশের বিভিন্ন স্তর ও খাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। হত্যা, খুন, গুম, অর্থপাচার ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, দেশকে উন্নয়নের পথে ফিরিয়ে নিতে সাত মাস যথেষ্ট সময় নয়। তারপরও নতুন সরকার উন্নয়নের কাজ শুরু করেছে।
সংস্কার প্রসঙ্গে স্পিকার বলেন, আইন ও কানুনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা দরকার। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও সরকারি দল ও বিরোধী দল দায়িত্বশীল ও সংযত ভূমিকা নিলে সমাধানের পথ বের করা সম্ভব।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংসদের আগামী অধিবেশনে সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল একমত হলে প্রয়োজনীয় আইনগত পরিবর্তন দ্রুত আনা সম্ভব হবে। সংস্কার কার্যক্রমের পর সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এর কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পিকার বলেন, জনগণ এখন বাক্স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে। আগের সরকারের সময়ে সত্য কথা বলার কারণে অনেককে ক্রসফায়ারে জীবন দিতে হয়েছে এবং অনেকে গুমের শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলী ও পারভেজের প্রসঙ্গও এ সময় উল্লেখ করেন স্পিকার।
ভোলা সার্কিট হাউসে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান, পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহ কাওছার, জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম নবী আলমগীর, সদস্যসচিব রাইসুল আলমসহ সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।