সুনামগঞ্জের দিরাই পৌরসভা এলাকায় গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) নগদ অর্থ কর্মসূচির আওতায় ৩৫টি উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অর্থবছরের শেষ দিকে অধিকাংশ প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দের অর্ধেক টাকা প্রকল্প সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের হিসাবে পরিশোধ করা হলেও টাকা পাওয়ার প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি। এতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেও ক্ষোভ ও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে দিরাই পৌরসভার কয়েকটি প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত প্রকল্পের অনেকগুলোর কাজের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। কয়েকটি প্রকল্পের সভাপতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বললে তারা বরাদ্দের টাকা পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও কবে কাজ শুরু বা শেষ করবেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্মারক নং-বাজাস/সঃসঃ/২০২৬/০০৩১, তারিখ ১৪ মে ২০২৬-এর তালিকা অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) নগদ অর্থ কর্মসূচির আওতায় দিরাই-শাল্লা নির্বাচনী এলাকার ১ম পর্যায়ের বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পগুলো নির্ধারণ করা হয়। সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী প্রকল্পের তালিকা দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজিব সরকারের কাছে পাঠান। পরে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে প্রকল্পগুলোর অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয়। তালিকায় দিরাই পৌরসভা এলাকায় রাস্তা নির্মাণ, সংস্কার, মাটি ভরাট, সিসিকরণ, মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, কবরস্থান, শ্মশানঘাটসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে-পূর্ব চণ্ডিপুর গুদারাঘাট মসজিদ থেকে খাতুনপুর পর্যন্ত রাস্তা মাটি ভরাট, পূর্ব চণ্ডিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার রাস্তা সিসিকরণ ও মাটি ভরাট, বজলু মিয়ার বাড়ির সীমানা থেকে হাওরের রাস্তা পর্যন্ত মাটি ভরাট, ওহি মিয়ার দোকান থেকে হাসান মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সিসিকরণ ও মাটি ভরাট, আতাউর মিয়ার বাড়ি থেকে সাদিকুর মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত মাটি ভরাট, জসিম উদ্দিনের বাসার সামনে থেকে কালাম মিয়ার বাসা পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার, দিরাই-শাল্লা সড়ক থেকে রাজাপুর গ্রামের এলেমান চৌধুরীর বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার এবং একই সড়ক থেকে মামুন মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত সিসিকরণ ও মাটি ভরাট।
এ ছাড়া রাধানগরের মেইন রোড থেকে নুরুল আমিন তালুকদারের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সিসিকরণ, দিরাই-শাল্লা সড়ক থেকে ইমন মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত সিসিকরণ, ঘাগটিয়া গ্রামের মশরালি মিয়ার বাড়ি থেকে ফারুক মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ, আরামবাগ-মজলিশপুর মেইন রোড থেকে মাওলানা ইলিয়াস মিয়ার বাড়ি হয়ে খাল পর্যন্ত রাস্তা মাটি ভরাট, ধল সংযোগ সড়ক থেকে আয়লাবাজের হেলাল মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ, সুজানগরের নদীর পাড় থেকে দিরাই-মদনপুর সড়ক পর্যন্ত মাটি ভরাট, গোলাপনগর থেকে দিরাই-মদনপুর সড়কের কর্ণগাঁও পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ, উলুকান্দি মেইন রোড থেকে জানে আলম মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ এবং আনোয়ার গ্রামের মাঝের সড়ক থেকে রজব আলী মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণের প্রকল্প রয়েছে।
তালিকায় আরও রয়েছে দিরাই-শ্যামারচর সড়ক থেকে ভরারগাঁও শিলবাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার, কনাইকাড়া থেকে নতুন বাগবাড়ি পুকুরপাড় পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ, মাদানি মহল্লার (লামাহাটি) মসজিদ উন্নয়ন, দিরাই উপজেলা অফিসার্স ক্লাব উন্নয়ন, উপজেলা পরিষদ কলোনির সামনের পুকুরপাড়ের জরাজীর্ণ ঘাটলা সংস্কার, চণ্ডিপুর টিপু মিয়ার বাড়ি থেকে হাফিজ উল্লাহর বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সিসিকরণ ও মাটি ভরাট, পূর্ব দিরাই বক্ত বাবুর দোকান থেকে পালহাটি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার, দোওজ পাকা রাস্তা থেকে জসিম মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সিসিকরণ ও মাটি ভরাট, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের উন্নয়ন, রাধানগর হাজী এমদাদ উল্লাহ মহাজিরে মক্কী ইসলামিয়া মাদ্রাসার উন্নয়ন, পূর্ব দিরাই শ্রী শ্রী কালিমন্দির উন্নয়ন, পুরাতন বাগবাড়ি কবরস্থান উন্নয়ন, শুকুরনগর শ্মশানঘাট উন্নয়ন, দিরাই-শাল্লা সড়ক থেকে রাজাপুর গ্রামের রাজীবের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মাটি ভরাট, মজলিশপুর ঋষিবাড়ি সংলগ্ন কালাচাঁন গাছের চারপাশে মাটি ভরাট এবং হারানপুর কামাল মিয়ার বাড়ি থেকে ইমাম সাহেবের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সিসিকরণ ও মাটি ভরাট। পূর্ব চণ্ডিপুর গুদারাঘাট মসজিদ থেকে খাতুনপুর পর্যন্ত রাস্তা মাটি ভরাট প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রাস্তাটির বেশিরভাগ অংশ শুকনো। তবে কয়েকটি সাঁকো রয়েছে, যেগুলো দিয়ে গ্রামের মানুষ চলাচল করছেন।
স্থানীয় আবুল খয়ের বলেন, ‘আমরা শুনেছি এমপি সাহেব এখানে তিন লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। যারা কাজ পেয়েছেন তারা অর্ধেক টাকা তুলে এনেছেন। কিন্তু এখনো কাজ করছেন না। গ্রামের বৃদ্ধ ও শিক্ষার্থীদের জন্য সাঁকো পারাপার অনেক কঠিন। আমরা ভেবেছিলাম রাস্তার কাজ হলে আমাদের দুর্ভোগ কিছুটা কমবে।’ তিনি অভিযোগ করেন, প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আওয়ামী লীগের লোকজন থাকায় কাজটি বিলম্বিত হচ্ছে।
চণ্ডিপুর টিপু মিয়ার বাড়ি থেকে হাফিজ উল্লাহর বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সিসিকরণ ও মাটি ভরাট প্রকল্পে তিন লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। প্রকল্প কমিটির সভাপতি জাহাঙ্গীরের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অর্ধেক টাকা পাওয়ার কথা স্বীকার করেন। তবে টাকা পাওয়ার প্রায় আড়াই মাস পরও কাজ শুরু না করার কারণ জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নন বলে মন্তব্য করেন। কবে কাজ শেষ করবেন-এমন প্রশ্নেরও তিনি নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাননি।
দোওজ পাকা রাস্তা থেকে জসিম মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সিসিকরণ ও মাটি ভরাট প্রকল্পে তিন লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রস্তাবিত রাস্তার সুবিধা মূলত একটি পরিবারের বাড়িতে যাওয়ার পথেই সীমাবদ্ধ। এ কারণে সরকারি অর্থে এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। দিরাই পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি বলেন, ‘এটা গ্রামের মানুষের কোনো উপকারে আসবে না। একজন মানুষের বাড়ির রাস্তা সরকারের টাকায় করতে হবে কেন? ইতোমধ্যে দেড় লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। সেখানে ২০-৩০ হাজার টাকার কাজ হয়েছে। বাকি কাজ হবে কি না, কেউ বলতে পারছে না।’
পৌরসভার সাতটি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনের পর স্থানীয় বাসিন্দা ও বিএনপি নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন, তালিকাভুক্ত ৩৫টি প্রকল্পের মধ্যে প্রায় ৩০টির কাজ এখনো শুরু হয়নি। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কাজ শুরু না হলে বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় নাও হতে পারে।
দিরাই পৌরসভা বিএনপির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান বলেন, ‘দিরাই-শাল্লার সংসদ সদস্য আমাদের বর্ষীয়ান নেতা নাছির উদ্দিন চৌধুরী বর্তমানে অসুস্থ। তাঁর মাধ্যমে যে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো এসেছে, আমরা দেখছি সেসব প্রকল্পের অনেক কাজ হয়নি। আমি পৌর বিএনপির আহ্বায়ক হয়েও জানি না এমপি বরাদ্দের কাজ কোথায় হয়েছে। পরে আমরা তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করে কাজের তালিকা সংগ্রহ করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘তালিকা পাওয়ার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি আমাদের বলেছেন, প্রকল্পের অর্ধেক টাকা দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের দাবি, এসব কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। জনগণের টাকার কাজ না হলে আমরা সেটা মেনে নেব না। কাজ না হলে সরকার প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা নেবে-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’ দিরাই উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সুমন মিয়া বলেন, ‘আমরা যখন জানতে পারলাম এমপি মহোদয় পৌরসভায় কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন, তখন কোথায় কী বরাদ্দ হয়েছে তা জানতাম না। পরে উপজেলা বিএনপি আমাকে তথ্য অধিকার আইনে কাজের তালিকা সংগ্রহের দায়িত্ব দেয়। আবেদন করার পর ইউএনও অফিস থেকে তালিকাটি দেওয়া হয়।’
দিরাই উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব মইন উদ্দিন চৌধুরী মাসুক বলেন, ‘আমাদের দল ও সরকার দেশে দুর্নীতি কমাতে চায়। আমাদের দিরাই-শাল্লার এমপি মহোদয় সারা জীবন দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। আমরা আশা করি, তিনি যে প্রকল্পগুলো দিয়েছেন সেগুলোর কাজ সঠিকভাবে হবে। কাদের প্রকল্প দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে আমাদের অভিযোগ নেই। তবে বরাদ্দ দেওয়া অর্থের বিপরীতে কাজ অবশ্যই হতে হবে।’ স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকায় তাঁর নাম ব্যবহার করে একটি ‘সিন্ডিকেট’ সক্রিয় হয়েছে। তাদের দাবি, এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের কেউ কেউ রয়েছেন। তাদের ভাষ্য, নাছির উদ্দিন চৌধুরী দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর অসুস্থতার সুযোগে কেউ যেন তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজিব সরকার বলেন, ‘এমপি মহোদয় আমাদের কাছে প্রকল্পের তালিকা ও কমিটি দিয়েছেন। আমরা সে অনুযায়ী বরাদ্দ দিয়েছি। অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) কাজের শুরুতে অর্ধেক টাকা পরিশোধের বিধান রয়েছে। তাই আমরা অর্ধেক টাকা পরিশোধ করেছি।’ কাজ শুরু না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও বলেন, ‘বরাদ্দ ও প্রকল্পে কিছু সংশোধনী এমপি মহোদয় দেবেন। এরপর কাজ হবে।’ তবে বরাদ্দের টাকা পাওয়ার পরও কেন তিন মাস ধরে অধিকাংশ প্রকল্পের