৪০ বছর পর অশ্রুসিক্ত বিদায়, ঘোড়ার গাড়িতে ‘রাজকীয়’ সম্মান পেলেন শিক্ষিকা

এফএনএস (এইচ এম জোবায়ের হোসাইন; ত্রিশাল, ময়মনসিংহ) : | প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:৩০ পিএম
৪০ বছর পর অশ্রুসিক্ত বিদায়, ঘোড়ার গাড়িতে ‘রাজকীয়’ সম্মান পেলেন শিক্ষিকা

চার দশক ধরে যাঁর স্নেহ-মমতায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য শিক্ষার্থীর শৈশব, সেই প্রিয় শিক্ষিকার বিদায়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি তাঁর সাবেক শিক্ষার্থীরা। কেউ কাঁদলেন, কেউ স্মৃতিচারণ করলেন, আবার কেউ ফুল হাতে দাঁড়িয়ে রইলেন নীরবে। শেষ পর্যন্ত ফুলে সজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে তুলে দিয়ে প্রিয় শিক্ষিকাকে জানানো হলো ব্যতিক্রমী ‘রাজকীয়’ বিদায়।

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার দেওয়ানীয়া বাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা জোৎস্না আরা বেগমের ৪০ বছরের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের অবসান উপলক্ষে বৃহস্পতিবার বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় গণসংবর্ধনা ও বিদায় অনুষ্ঠানের। প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আব্দুল আলীম। প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট সমাজসেবক মনিরুজ্জামান সোমেল।

মফিজুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দেওয়ানীয়া বাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি মনিরুজ্জামান মিলন, প্রাক্তন শিক্ষক মজিবুর রহমান, প্রধান শিক্ষক আয়েশা মোস্তারি, প্রাক্তন শিক্ষার্থী আসাদুজ্জামান আসাদ, ১৯৮৪ ব্যাচের শিক্ষার্থী সুজন, ১৯৯৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী ওসমান গনি ও মামুন মিয়া, ১৯৯৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. সেলিম ফরাজী, মুফতি মাওলানা সোহাইল মিয়া, মো. রাসেল, সহকারী শিক্ষিকা তাসলিমা বেগমসহ বিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী।

অনুষ্ঠানে বিদায়ী শিক্ষিকার উদ্দেশ্যে মানপত্র পাঠ করেন বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা নূরে গুলশান। বক্তারা বলেন, জোৎস্না আরা বেগম ছিলেন শিক্ষার্থীদের কাছে শুধু একজন শিক্ষক নন, ছিলেন অভিভাবকের মতো। দীর্ঘ ৪০ বছর তিনি নিষ্ঠা, মমতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেছেন। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা অনেক শিক্ষার্থী বর্তমানে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন।

আয়োজক সেলিম ফরাজী বলেন, “জোৎস্না ম্যাডাম অত্যন্ত ভদ্র ও নরম মনের মানুষ ছিলেন। দীর্ঘ ৪০ বছর তিনি শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো আদর-স্নেহ দিয়ে শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর শিক্ষা, আদর্শ ও মূল্যবোধ আমাদের চলার পথে চিরদিনের প্রেরণা হয়ে থাকবে।”

প্রিয় শিক্ষিকার বিদায় উপলক্ষে বিদ্যালয়ে জড়ো হন বিভিন্ন ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থীরা। বয়সের ব্যবধান ভুলে তাঁরা ফিরে যান শৈশবের সেই দিনগুলোতে। কেউ স্মৃতিচারণ করেন, কেউ শিক্ষিকার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। অনেকের চোখে তখন ছিল অশ্রু।

একপর্যায়ে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ পরিণত হয় এক আবেগঘন মিলনমেলায়। চার দশক আগে যাঁদের ছোট্ট হাত ধরে পড়ার জগতে প্রবেশ, সেই শিক্ষার্থীরাই আজ জীবনের নানা পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ফিরে এসেছেন তাঁদের প্রিয় শিক্ষিকার বিদায় জানাতে।

বিদায়ী শিক্ষিকা জোৎস্না আরা বেগমও শিক্ষার্থীদের ভালোবাসায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। দীর্ঘ কর্মজীবনের নানা স্মৃতি তুলে ধরতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে।

তবে অনুষ্ঠানের শেষ মুহূর্তটি ছিল সবচেয়ে আবেগঘন। ফুলে ফুলে সাজানো ঘোড়ার গাড়িতে তুলে দেওয়া হয় জোৎস্না আরা বেগমকে। প্রাক্তন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও এলাকাবাসী হাত নেড়ে, ফুল ছুড়ে এবং অশ্রুসিক্ত চোখে তাঁকে বিদায় জানান।

ঘোড়ার গাড়িটি যখন ধীরে ধীরে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ পেরিয়ে যাচ্ছিল, তখন চারপাশে যেন নেমে আসে নীরব আবেগ। চার দশকের শিক্ষকতা জীবনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হলেও শিক্ষার্থীদের ভালোবাসার সেই বন্ধন যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে।

চাকরি জীবনের অবসান হয়েছে, কিন্তু ‘জোৎস্না ম্যাডাম’ পরিচয়ের অবসান হয়নি। তাঁর শেখানো অক্ষর, আদর্শ ও ভালোবাসা বেঁচে থাকবে তাঁর গড়ে তোলা অসংখ্য শিক্ষার্থীর হৃদয়ে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে