২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর চাকরিচ্যুত কোনো নিরপরাধ বিডিআর সদস্যকে পুনরায় বিজিবিতে নিয়োগের সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, তৎকালীন আইন ও বিধি অনুযায়ী বিচারিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরই সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে হত্যা ও বিস্ফোরক মামলায় অভিযুক্তদের বিচারিক কার্যক্রম চলমান থাকায় সংশ্লিষ্টদের চাকরিতে পুনর্বহালের সুযোগ নেই।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের লিখিত জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
গাইবান্ধা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল ওয়ারেছ জানতে চান, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআরের একটি বিদ্রোহী গ্রুপের সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচারে নিরপরাধ যেসব বিডিআর সদস্য চাকরিচ্যুত হয়েছেন, তাদের আবার বিজিবিতে চাকরি দেওয়া হবে কি না।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, পিলখানায় বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন বিডিআরের আইন ও বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় স্পেশাল কোর্ট এবং প্রশাসনিক বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের শনাক্ত করা হয়। বিভিন্ন ইউনিটের গঠিত তদন্ত পর্ষদের মাধ্যমেও এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এসব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মোট ৬ হাজার ২৮৬ জন বিডিআর সদস্যকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। তাদের মধ্যে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সদস্যও ছিলেন। পাশাপাশি প্রশাসনিক বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে ২ হাজার ৫১০ জনকে পেনশন সুবিধাসহ চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে চাকরিচ্যুত বিডিআর সদস্যের সংখ্যা ৮ হাজার ৭৯৬ জন বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এসব শাস্তি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর দেওয়া হয়েছে। তাই কোনো নিরপরাধ বিডিআর সদস্যকে চাকরিচ্যুত করা হয়নি এবং চাকরিচ্যুত সদস্যদের পুনর্বহালের সুযোগ নেই।
৮৫০ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চাকরিচ্যুত বিডিআর সদস্যদের মধ্য থেকে ৮৫০ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করা হয়েছে। ওই মামলায় নিম্ন আদালত বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছেন। বর্তমানে মামলাটির আপিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে চলমান রয়েছে।
এ ছাড়া ৮৩৪ জন বিডিআর সদস্যের বিরুদ্ধে একটি বিস্ফোরক মামলা করা হয়েছে। মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম নিম্ন আদালতে চলমান রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, হত্যা ও বিস্ফোরক মামলায় বিচারিক কার্যক্রম চলমান থাকায় ওই দুই মামলায় আসামি হিসেবে থাকা চাকরিচ্যুত বিডিআর সদস্যদের চাকরিতে পুনর্বহালের সুযোগ নেই।
সাজা শেষ হলে মুক্তির আইনি প্রক্রিয়া
নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. ফজলে হুদার এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিডিআর বিদ্রোহে সাজাপ্রাপ্ত সদস্যদের সাজা শেষে মুক্তির বিষয়েও সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।
সংসদ সদস্য জানতে চান, বিডিআর বিদ্রোহে সাজাপ্রাপ্ত অনেক সদস্য সাজা ভোগ করে বের হওয়ার পরও আওয়ামী লীগ আমলে করা মামলায় হয়রানির শিকার হচ্ছেন কি না এবং এ ধরনের হয়রানি বন্ধে মন্ত্রণালয় কোনো পদক্ষেপ নেবে কি না। একই সঙ্গে সাজা শেষ হওয়া সদস্যদের দ্রুত খালাসের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না, সেটিও জানতে চান তিনি।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিডিআর বিদ্রোহ সংক্রান্ত মামলাগুলো আদালতের নির্দিষ্ট বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে। প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি সাজা ভোগ করার পর তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলা থাকলে সেটি যথাযথ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হবে।
তিনি জানান, শুধু পরিচয়, আগের সাজা বা রাজনৈতিক বিবেচনার ভিত্তিতে কেউ যেন অযথা হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে পুলিশকে স্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কেউ আইনবহির্ভূত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি, মিথ্যা মামলা কিংবা অযৌক্তিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে অভিযোগের সত্যতা ও বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তার ভাষ্য, বিডিআর বিদ্রোহে সাজাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি সাজা শেষ করার পর তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলা না থাকলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় কারাগার থেকে মুক্তি পাবেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা
একই অধিবেশনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের বিরোধী দলের সদস্য মো. নূরুল ইসলামের টেবিলে উপস্থাপিত তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সমুন্নত রাখা এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। খুন, ছিনতাই, অপহরণসহ সব ধরনের অপরাধ দমনে বাংলাদেশ পুলিশ তাদের তৎপরতা জোরদার করেছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী ভঙ্গুর অবস্থা থেকে পুলিশের মনোবল ফিরিয়ে এনে তাদের পূর্ণ শক্তিতে কাজ করার উপযোগী করে তোলা হচ্ছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নতির জন্য স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এসব পরিকল্পনা অনুযায়ী জনগণের সার্বিক সহযোগিতায় দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে আরও দৃশ্যমান উন্নতি আনা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ পুলিশ বিভিন্ন অপারেশনাল কার্যক্রমের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছে বলেও সংসদকে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।