বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কে ইটের সলিং

বিটুমিনের পরিবর্তে ইট-বালু দিয়ে সড়ক সংস্কার, প্রশ্নের মুখে সওজ

এফএনএস (বরিশাল প্রতিবেদক) : | প্রকাশ: ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:০১ পিএম
বিটুমিনের পরিবর্তে ইট-বালু দিয়ে সড়ক সংস্কার, প্রশ্নের মুখে সওজ

পাথর ও পিচের পরিবর্তে ইটের সলিং করে মহাসড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ নামেমাত্র সংস্কার করছে বরিশাল সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। এতে করে সড়ক সংস্কারে নির্ধারিত কারিগরি স্পেসিফিকেশন ও নির্মাণমান অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। একইসাথে কাজের মান যাচাই ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের তদারকি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কয়েক সপ্তাহের টানা বর্ষণে অসংখ্য খানাখন্দে ভরে গেছে দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার খ্যাত ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের গৌরনদীর অংশ। সড়কের কোথাও কোথাও পিচ-পাথর একাকার হয়ে জেগে উঠছে টিউমার। আবার কোথাও সৃষ্টি হচ্ছে ছোটবড় অসংখ্য গর্ত। যা দেখে বোঝার উপায় নেই এটা ব্যস্ততম ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক। দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির বেহাল দশায় চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন দক্ষিণাঞ্চলগামী যাত্রীরা।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকালে গৌরনদী উপজেলার ভুরঘাটা বাসস্ট্যান্ড থেকে উজিরপুরের সীমান্ত পর্যন্ত ১৯ কিলোমিটার মহাসড়ক ঘুরে দেখা গেছে, মহাসড়কের অসংখ্যস্থানে ছোট-বড় গর্তের চিত্র। বিশেষ করে ব্যস্ততম বার্থী বাসস্ট্যান্ড, ইল্লা, কটকস্থল, সাউদেরখালপাড়, টরকী বাসস্ট্যান্ড, মদিনা স্ট্যান্ড, গৌরনদী বাসস্ট্যান্ড, আশোকাঠী, কাসেমাবাদ, বেজহার, মাহিলাড়া, বাটাজোর, বামরাইল ও সানুহার বাসস্ট্যান্ডের অবস্থা সবচেয়ে বেহাল। এসব বাসস্ট্যান্ডের সড়কের মাঝখানে ছোট-বড় অসংখ্য গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। যে কারণে চরম ঝুঁকির মধ্যে যানবাহন চলাচল করছে।

সূত্রমতে, মহাসড়কের বেহালদশার কারণে প্রায় প্রতিদিনই ছোট-বড় দূর্ঘটনা লেগেই রয়েছে। এরমধ্যে বিপর্যস্ত মহাসড়কের গর্তের মধ্যে ইট দিয়ে গর্ত ভরাটের চেষ্টা করে যাচ্ছে সড়ক ও জনপদ বিভাগ। এমনকি অনেকস্থানে ইটের সলিং করে মহাসড়ক সংস্কার করা হয়েছে।

সূত্রমতে, সম্প্রতি সময়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পর জেলার সড়ক ব্যবস্থাপনা ও সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। বেহাল সড়ক দ্রুত সংস্কার না করা এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়েও নানা অভিযোগ উঠেছে।

ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের গৌরনদীর ভুরঘাটা থেকে বরিশাল পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যস্ততম মহাসড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশে মেরামতকাজের সময় কয়েকজন শ্রমিককে ইট ভেঙে খোয়া তৈরি করে ও বালু দিয়ে গর্ত ভরাট করতে দেখা গেছে। এমনকি অধিকাংশস্থানে শুধু ইটের টুকরো ফেলে গর্ত ভরাট করা হয়েছে। পাশাপাশি মহাসড়কের মধ্যে ইটের সলিং করতেও দেখা গেছে। তবে ওইসময় কোন পাথর কিংবা পিচের ব্যবহারের দৃশ্য দেখা যায়নি। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কের গর্ত ইটের টুকরো দিয়ে সাময়িকভাবে ভরাট করা হলে যানবাহনের চাঁপ এবং বৃষ্টির পানিতে সেগুলো দ্রুত সরে যাচ্ছে। এতে অল্প সময়ের মধ্যেই একইস্থানে ফের গর্ত তৈরি হচ্ছে। এমনকি বেপরোয়াগতির যানবাহনের কারণে ওইসব ইটের টুকরোগুলো ছিটকে পথচারী কিংবা ছোট যানবাহনের ওপর পরে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। আবার রোদের সময় ওইসব ইটের টুকরোগুলো ভেঙে সৃষ্টি হওয়া ধুলাবালিতে একাকার হয়ে যাচ্ছে মহাসড়ক। যেকারণে ছোট যানবাহনের চালক, পথচারী ও মহাসড়কের পাশের ব্যবসায়ীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এমনকি এসব ধুলা-বালির কারণে বিভিন্ন রোগ দেখা দেয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সেক্ষেত্রে একদিকে সড়ক সংস্কারে সরকারি অর্থ ব্যয়ের পুনরাবৃত্তি ও অন্যদিকে জনদুর্ভোগ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েই চলছে।

স্থানীয়রা বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সড়ক মেরামতের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কাজের নির্ধারিত কারিগরি স্পেসিফিকেশন ও নির্মাণমান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি মেরামতকাজের উপকরণ, পদ্ধতি ও গুণগতমান যাচাইয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীদের তদারকি কতোটা কার্যকর তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

স্থানীয়রা আরও জানিয়েছেন, সড়কের গর্তে সাময়িকভাবে ইটের খোয়া বা অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করা হয়ে থাকলে সেটি কোন ধরনের মেরামত পদ্ধতির আওতায় করা হচ্ছে, তা জনসমক্ষে স্পষ্ট করা উচিত। কারণ সাময়িক রক্ষণাবেক্ষণ ও স্থায়ী সংস্কারের পদ্ধতি এক নয়। কাজের ধরন অনুযায়ী নির্ধারিত উপকরণ ও কারিগরি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেটিই এখন যাচাইয়ের বিষয়।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সাময়িক জোড়াতালি দিয়ে সড়ক মেরামতের পরিবর্তে নির্ধারিত কারিগরি মান বজায় রেখে টেকসই সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কাজের মান পরীক্ষা করে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, কয়েকদিনের টানা বর্ষণে জনজীবনের ন্যায় ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক বিপর্যস্ত হয়ে পরেছে। মহাসড়কের এমন কোন স্থান নেই যেখানে ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়নি। মহাসড়কের যেসব জায়গা প্রশস্ত করা হয়েছে, তা উঁচু-নিচু হওয়ায় যানবাহন চলাচল করতে পারছেনা। আবার কোথাও কোথাও সড়কের দুই পাশ কেটে ফেলে রাখা হয়েছে। সরু মহাসড়কে অসংখ্য গর্তের পাশাপাশি চালকদের বেপরোয়াগতি এবং বিবেকহীন প্রতিযোগিতায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনা লেগেই রয়েছে।

তারা আরও জানিয়েছেন, সড়ক ও জনপদ বিভাগ ইট দিয়ে গর্ত ভরাটের চেষ্টা করে যাচ্ছে। তবে ভারি যানবাহনের চাঁপায় ইটগুড়ো হয়ে ধুলোর সৃষ্টি হচ্ছে। এতে ছোট যানবাহনের চালক ও পথচারীরা মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ দীর্ঘবছর ধরে কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলায় মহাসড়কের গৌরনদী অংশের অবস্থা চরম বেহাল।

মহাসড়কে নিয়মিত যাতায়াত করা দূরপাল্লার একাধিক চালকরা জানিয়েছেন, মহাসড়কের গৌরনদী অংশের কোথাও খানাখন্দ আবার কোথাও ঢেউয়ের মত উঁচু-নিচু। ফলে উঁচু-নিচু এ মহাসড়ক পার হতে মালবাহী ও যাত্রীবাহী পরিবহনের চাকা গর্তে পরে ইঞ্জিন ও টায়ার-টিউব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি যাত্রীদের চরম ভোগান্তি হচ্ছে। মহাসড়কের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা দ্রুত মেরামতের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি তারা (চালক) দাবি জানিয়েছেন।

গৌরনদী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ষ্টেশন অফিসার মো. মিজানুর রহমান বলেন, মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে ছোট-বড় গর্তে ভরে গেছে। এছাড়াও মূল অংশের সঙ্গে বর্ধিত অংশ উঁচু-নিচু হওয়ায় কম প্রশস্ত সড়ক দিয়ে ওভার স্পীডে যানবাহনগুলো যাতায়ত করে।

তাছাড়া মহাসড়ক দিয়ে চলাচলকারী থ্রি-হুইলারগুলো বর্ধিত অংশে না গিয়ে মূল সড়কে চলাচল করে। যে কারণে সড়কে দুর্ঘটনা লেগেই আছে। সড়কটি সম্পূর্ণ বর্ধিত করে মেরামত করা হলে এবং চালকদের সচেতন করে তোলা হলে এ মহাসড়কে দুর্ঘটনা কমে আসবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এ বিষয়ে বরিশাল সড়ক ও জনপদ বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. শাহিন খান জানিয়েছেন, ভারি বর্ষার কারণে সড়কের কোথাও কোথাও গর্ত হয়েছে। যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে তাৎক্ষনিকভাবে এসব গর্তের মধ্যে ইটের গুড়ি ফেলে মেরামত করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ইটদিয়ে সংস্কারের প্রক্রিয়া এটা প্রাথমিক কাজ। বৃষ্টি কমার পর স্থায়ীভাবে পাথর ও বিটুমিন ব্যবহার করে মহাসড়ক সংস্কারের কাজ করা হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে