বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য আবারও ব্যাংক খাতের গভীর সংকটকে সামনে এনেছে। চলতি বছরের জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। ডিসেম্বর থেকে জুনে বৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এ পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, বরং আর্থিক খাতের দুর্বলতা ও নীতিগত ব্যর্থতার প্রতিফলন। বছরের পর বছর নানা সুবিধা, পুনঃতফসিল, ঋণ আদায়ে ছাড় এবং নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হলেও খেলাপি ঋণ কমছে না। বরং ঋণগ্রহীতাদের দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও শক্ত হচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হচ্ছে, নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা কমছে এবং অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে। খেলাপি ঋণের হার এখন ৩২ শতাংশের বেশি, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় ভয়াবহ। এ অবস্থায় ব্যাংক খাতের প্রতি আস্থা কমছে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও সতর্ক হয়ে পড়ছেন। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে সাধারণ আমানতকারীর। তাদের সঞ্চয় ঝুঁকির মুখে পড়ছে, অথচ দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। আমরা মনে করি, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে শুধু পুনঃতফসিল বা সুবিধা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন কঠোর জবাবদিহি, ঋণ আদায়ে স্বচ্ছতা এবং ব্যাংক খাত সংস্কার। ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগ করতে হবে, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে ঋণ আদায় নিশ্চিত করতে হবে এবং ব্যাংক পরিচালনায় দক্ষতা ও সততা ফিরিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং তদারকি কাঠামোতে সংস্কার আনতে হবে। খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংক খাতকে দুর্বল করছে না, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে সাহসী পদক্ষেপ ছাড়া ব্যাংক খাতের আস্থা ফিরবে না। এখনই সময় দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভেঙে কঠোর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করার।