দেশের যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। রাজধানীর যানজট কমানো, শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত সংযোগ স্থাপন এবং উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ সহজ করার লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্পটির ব্যয় ৬০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি এবং বাস্তবায়নকাল আরও চার বছর বাড়ানোর প্রস্তাব বড় অবকাঠামো প্রকল্পের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন দক্ষতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী প্রকল্পের ব্যয় ১৬ হাজার ৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২৭ হাজার ৪৫ কোটি টাকায় উন্নীত হচ্ছে। একই সঙ্গে ২২ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পটি এখন ২০ সালের জুন পর্যন্ত গড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সরকার ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ডলারের বিনিময় হার, মূল্যস্ফীতি, শুল্ক বৃদ্ধি, ভূমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি স্থানান্তর এবং নকশাগত পরিবর্তনকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এসব কারণের বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ওপর পড়েছে। তবে একই সঙ্গে এটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন যে, বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের প্রাথমিক পরিকল্পনা ও সম্ভাব্যতা যাচাই কতটা বাস্তবসম্মত ছিল। বাস্তবায়নের মাঝপথে ধারাবাহিক ব্যয় বৃদ্ধি ও সময়সীমা সম্প্রসারণ যদি নিয়মে পরিণত হয়, তবে তা সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প পরিকল্পনার দক্ষতা নিয়ে জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। প্রকল্পের নকশায় পরিবর্তন কখন প্রয়োজনীয়, আর কখন পরিকল্পনার ঘাটতির প্রতিফলন-সেটিও স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা জরুরি। অন্যদিকে সংশোধিত নকশায় বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, এমআরটি লাইন-১ এবং রেলপথ সম্প্রসারণের সঙ্গে সংযোগ যুক্ত হওয়ায় প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা বাড়বে বলেই ধারণা করা যায়। সমন্বিত যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এসব সংযোজন দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফল দিতে পারে। কিন্তু উন্নত নকশার সুফল তখনই মিলবে, যখন প্রকল্পটি নির্ধারিত নতুন সময়সীমার মধ্যে মানসম্পন্নভাবে সম্পন্ন হবে। বাংলাদেশে বড় প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে ব্যয় ও সময় বৃদ্ধি প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রকল্প প্রণয়ন পর্যায়ে আরও বাস্তবভিত্তিক ব্যয় নির্ধারণ, ঝুঁকি বিশ্লেষণ, কার্যকর তদারকি এবং নিয়মিত অগ্রগতি মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি জনগণের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নিঃসন্দেহে দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। তবে এর প্রকৃত সাফল্য কেবল ব্যয় বা দৈর্ঘ্যে নয়; বরং সময়মতো, মানসম্পন্ন ও সাশ্রয়ী বাস্তবায়নের মধ্যেই নিহিত। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন প্রতিটি অতিরিক্ত ব্যয়ের যৌক্তিকতা জনগণের কাছে স্পষ্ট হবে এবং প্রকল্পটি প্রত্যাশিত সুফল বাস্তবে এনে দিতে সক্ষম হবে।