রাজধানী ঢাকা ক্রমেই পরিচ্ছন্ন নগরের বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ময়লা-আবর্জনার চাপে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকির মুখে পড়ছে। যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা, অপরিকল্পিত সংগ্রহ ও অপসারণ ব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত তদারকি এবং নাগরিক অসচেতনতার কারণে পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টিতে সেই সংকট আরও প্রকট হয়েছে। জলাবদ্ধতার সঙ্গে বর্জ্য মিশে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দুর্গন্ধ, পরিবেশদূষণ এবং রোগবালাই ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, রেললাইন, বাজার, ফুটপাত ও আবাসিক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্য জমে থাকার চিত্র নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে। অনেক স্থানে খোলা ট্রাকে বর্জ্য পরিবহনের সময় রাস্তায় আবর্জনা ছড়িয়ে পড়ছে, আবার কোথাও পর্যাপ্ত ডাস্টবিন ও বর্জ্য সংগ্রহের অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। ফলে নাগরিকদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নোংরা পরিবেশে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষ করে উন্মুক্ত স্থানে পশুর বর্জ্য, পচনশীল আবর্জনা এবং জলাবদ্ধতা মশা-মাছি ও পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রতিদিন কয়েক হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হলেও এর একটি বড় অংশ যথাযথভাবে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হচ্ছে না। গত কয়েক বছরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও নগরজুড়ে অনিয়ন্ত্রিত ভাগাড়ের উপস্থিতি এবং পুনর্ব্যবহার ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তির দুর্বলতা প্রমাণ করে যে, সমস্যাটি কেবল অর্থের নয়; বরং পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও জবাবদিহিরও। অবশ্য এই সংকটের জন্য শুধু সিটি করপোরেশনকে দায়ী করলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। নাগরিকদের একাংশও নিয়ম না মেনে যত্রতত্র বর্জ্য ফেলছেন, বাজার ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অনেকেই নির্ধারিত ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করছেন না। ফলে পরিচ্ছন্ন নগর গড়ে তোলার দায়িত্ব সরকার ও নাগরিক-উভয় পক্ষেরই। সিটি করপোরেশন আধুনিক যন্ত্রপাতি, জনবল বৃদ্ধি এবং দ্রুত বর্জ্য অপসারণের উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি উৎসেই বর্জ্য পৃথকীকরণ, খোলা ট্রাকে বর্জ্য পরিবহন বন্ধ, নিয়মিত তদারকি, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা নিরুৎসাহিত করতে হবে এবং নাগরিক সচেতনতা বাড়াতে ধারাবাহিক প্রচার চালাতে হবে। পরিচ্ছন্ন নগর কেবল নান্দনিকতার বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জীবনমানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সমন্বিত পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং নাগরিক দায়িত্ববোধ-এই তিনটির সমন্বয়ই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ভিত্তি।