মাদারীপুরে অন্ধকার ঘরে আলোর স্বপ্ন: শিবচরের অদম্য উম্মে হানির আকূতি

এফএনএস (এস. এম. রাসেল; মাদারীপুর) : | প্রকাশ: ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ০৫:১৮ পিএম
মাদারীপুরে অন্ধকার ঘরে আলোর স্বপ্ন: শিবচরের অদম্য উম্মে হানির আকূতি

তীব্র গরমে কপাল ঘেমে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ছে খাতার পাতায়। এক হাতে তালপাখা আর অন্য হাতে কলম চেপে ধরে মোমবাতির টিমটিমে আলোয় পড়া মুখস্থ করছে ১৮ বছরের তরুণী উম্মে হানি। চারপাশের বাড়িগুলোতে যখন বিদ্যুতের আলো জ্বলছে, তখন আধুনিকায়নের এই যুগে এসেও তার চারপাশ আচ্ছন্ন হয়ে আছে ভুতুড়ে অন্ধকারে। সব প্রতিকূলতাকে জয় করে ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় মাদারীপুরের বাঁশকান্দি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ ৪.৭৮ পেয়ে উত্তীর্ণ হওয়া এই অদম্য মেধাবীর পড়াশোনার পথে এখন সবচেয়ে বড় বাধা—একটি বিদ্যুৎ সংযোগ।  মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার বাঁশকান্দি ইউনিয়নের চর শেখপুর গ্রামের এই তরুণীর জীবনের গল্পটি কেবল সংগ্রামের নয়, চরম অবহেলারও। পিতা হাবিবুর রহমান গত ১৮ বছর ধরে স্ত্রী-সন্তানের কোনো খোঁজ নেন না। মাথার ওপর থেকে বাবার ছায়া সরে গেলে বাধ্য হয়ে দীর্ঘদিন ঢাকায় ভাড়া বাসায় মানবেতর জীবনযাপন করতে হয় পরিবারটিকে। পরবর্তীতে মামা শেখ শফিকুল ইসলামের সহায়তায় চার বছর আগে চর শেখপুরে মামাবাড়ির জমিতে ছোট একটি ঘর তুলে আশ্রয় পান তারা।  বর্তমানে স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় রান্নার কাজ করে মা সেলিনা বেগম যা পান, তা দিয়েই কোনোমতে এক বেলা খেয়ে না-খেয়ে চলে সংসার। বড় মেয়ের বিয়ে হলেও ছোট মেয়ে উম্মে হানির পড়াশোনার প্রতি তীব্র আগ্রহ দেখে মা সব কষ্ট আড়াল করে তাকে এগিয়ে নেওয়ার লড়াই চালাচ্ছেন। উম্মে হানিরও স্বপ্ন সুদূরপ্রসারী—এইচএসসিতে ভালো ফলাফল করে ভর্তি হতে চায় দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।  কিন্তু সেই স্বপ্নে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে চার দেওয়ালের বিদ্যুৎহীন অন্ধকার। ঘর তোলার শুরু থেকেই পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ পাওয়ার জন্য মা-মেয়ে দরজায় দরজায় ঘুরেও আজও আলো পাননি। ঘরের ঠিক পাশেই বৈদ্যুতিক খুঁটি পোঁতা হলেও বাধ সাধেন প্রভাবশালী প্রতিবেশী আবু বেপারী, বাবুল বেপারী ও হাবু বেপারী। তাদের জমির ওপর দিয়ে বিদ্যুতের তার টানতে দেওয়া হবে না—এই অন্যায্য আপত্তিতে আটকে যায় উম্মে হানির ঘরে আলো জ্বলার স্বপ্ন। অসচ্ছল ও দুর্বল পরিবারটি প্রভাবশালী প্রতিবেশীদের আপত্তি ডিঙিয়ে লাইন নেওয়ার শক্তি খুঁজে পায়নি।  উম্মে হানির মা সেলিনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “১৮ বছর ধরে স্বামী খোঁজ নেয় না। ঢাকা থেকে এসে ভাইয়ের সহযোগিতায় একখানা ঘর তুলেছি। পাশের সব বাড়িতে আলো জ্বলে, অথচ আমার মেয়েটা হারিকেন আর মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়ে। বিদ্যুতের খুঁটি বসানো হলেও প্রতিবেশীদের আপত্তিতে সংযোগ পাচ্ছি না। আমরা অসহায় মানুষ, কার কাছে বিচার চাইব? ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কি একটু দয়া করে আমার মেধাবী মেয়েটার জন্য বিদ্যুতের ব্যবস্থা করে দেবে না?”  বিদ্যুৎহীন জীবনের কষ্টের কথা জানাতে গিয়ে অশ্রুসজল চোখে উম্মে হানি বলে, “বিদ্যুৎ না থাকায় পড়ার প্রচণ্ড ক্ষতি হচ্ছে। তীব্র গরমে পড়া তো দূরের কথা, টেবিলে বসাই যায় না। মাঝে মাঝে অন্যের বাড়িতে গিয়ে পড়তে হয়, যা খুবই অপমানজনক। উচ্চশিক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ঠিকমতো পড়তে না পারলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন তো দূরে থাক, আমার পুরো ভবিষ্যৎই অন্ধকার হয়ে যাবে।”  স্থানীয় মসজিদের ইমাম শেখ রফিকুল ইসলাম, প্রতিবেশী মো. পারভেজ এবং লিপি বেগম আফসোস প্রকাশ করে জানান, চার বছর ধরে একটি পরিবার বিদ্যুৎহীন—ভাবতেই কষ্ট হয়। ঢাকা থেকে এসে মামার সহায়তায় মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলেও বিদ্যুৎ না থাকাটা বড় নির্মম। এমন প্রতিকূল পরিবেশেও মেয়েটি যে ফল করেছে, তা অবিশ্বাস্য। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে সে দেশের জন্য বড় সম্পদে পরিণত হতে পারবে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, মেয়েটির ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে জরুরি ভিত্তিতে যেন বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান করা হয়।  এ ব্যাপারে মাদারীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জিএম সুশান্ত রায় জানান, স্থানীয় ব্যক্তির বাধার কারণে এত দিন সংযোগ দেওয়া যায়নি। স্থানীয়ভাবে ওই বাধা দূর করা সম্ভব হলে এক দিনের মধ্যেই পরিবারটিকে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে