নেপালে ভয়াবহ বন্যা: নিখোঁজ ৪,২৪৭, মৃতের সংখ্যা ৯০৩

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | প্রকাশ: ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ০২:৪৫ পিএম
নেপালে ভয়াবহ বন্যা: নিখোঁজ ৪,২৪৭, মৃতের সংখ্যা ৯০৩

নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৪ হাজার ২৪৭ জনে দাঁড়িয়েছে। তাদের মধ্যে ৩ হাজার ৬৫৫ জন নেপালের নাগরিক এবং ৫৯২ জন বিদেশি। বন্যায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৯০৩ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে শত শত মানুষ দেশটির জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী বলে জানিয়েছে বিবিসি।

বুধবারের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর নিখোঁজের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। রোববার পর্যন্ত নিখোঁজের সংখ্যা ২ হাজার ৫০২ জন বলে জানানো হয়েছিল। নতুন হিসাবে সেই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

উদ্ধারকারীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন নিখোঁজ জলবিদ্যুৎকর্মীদের নিয়ে। মোট ৯৩৩ জন জলবিদ্যুৎকর্মীর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের অনেকেই রসুয়া জেলার ত্রিশুলি-৩এ জলবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং চিলিমের বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের কেউ কেউ বন্যার সময় প্রকল্পের টানেলের ভেতরে আটকা পড়েছেন।

ত্রিশুলি-৩এ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে উদ্ধারকারীরা টানেলের ভেতরে প্রবেশের মতো একটি পথ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে টানেলের ভেতরে কাজ করা উদ্ধারকারী দল ডাকাডাকি করেও কারও সাড়া পায়নি বলে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের কার্যালয় জানিয়েছে।

নিখোঁজদের সন্ধানে নেপালের পুলিশ, সেনাবাহিনী ও অন্যান্য উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে ভারত ও চীনের আন্তর্জাতিক টানেল উদ্ধারকারী দলও কাজ করছে। তবে উদ্ধার অভিযানে কিছুটা দেরি হওয়ায় নিখোঁজদের স্বজনদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ফলে দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে হেলিকপ্টারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে উদ্ধারকারী দলগুলোকে। তবে নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জরুরি উদ্ধার ও ত্রাণসামগ্রী পরিবহনের বাইরে হেলিকপ্টার ব্যবহার না করার অনুরোধ জানিয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, বিকল্প সড়কপথগুলো ধীরে ধীরে চালু হচ্ছে এবং সম্ভব হলে সেগুলো ব্যবহার করা উচিত।

গ্রাম নিশ্চিহ্ন, স্বজনদের অপেক্ষা

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালের সানু ভারখু এলাকায় বন্যার ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র ভয়াবহ। ভোতে কোশি নদীর তীরে আগে যে গ্রামটি মানুষের বসতিতে জমজমাট ছিল, বন্যার পর সেখানে এখন পড়ে আছে বিস্তীর্ণ অনুর্বর জমি এবং একটি মাত্র ভবন।

ওই এলাকার কাছেই চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলের প্রবেশপথ দেখা যাচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানকার আটজন কর্মীর কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের ধারণা, ছয়জন এখনো টানেলের ভেতরে আটকা থাকতে পারেন।

স্থানীয় এক ব্যক্তি বিবিসিকে জানান, তার বাবা-মা কাঠমান্ডুতে নিরাপদে আছেন। তবে পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য নিখোঁজ। তাদের বেঁচে থাকার আশা তিনি প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন।

মাগুরার মতো দুর্গম এলাকাগুলোতে বহু মানুষের কাছে এই বন্যা ব্যক্তিগত শোকের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ধুনচে এলাকায় বিবিসির সঙ্গে কথা বলা এক ব্যক্তি জানান, সেখানে যার সঙ্গেই কথা বলা যায়, তিনি কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যুর কথা জানেন।

তিব্বতেও বাড়ছে উদ্বেগ

নেপালের পাশাপাশি চীনের তিব্বত অংশেও ভয়াবহ বন্যার প্রভাব পড়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১৬ এবং নিখোঁজ ৫৪৬ জন।

তিব্বতে উদ্ধারকারীরা গত সপ্তাহের শেষ দিকের পর আর কোনো জীবিত ব্যক্তিকে খুঁজে পাননি। ফলে ধ্বংসস্তূপ ও দুর্গম এলাকায় আটকে থাকা মানুষদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা কমে আসছে। তারপরও উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছে দলগুলো।

উদ্ধারকারীদের ধসে পড়া পাহাড়ের ঢাল বেয়ে দড়ি ব্যবহার করে নামতে, কাদার মধ্যে খুঁজতে এবং নিখোঁজদের নাম ধরে ডাকতে দেখা যাচ্ছে। তবে কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এখনো সাড়া মেলেনি।

এদিকে তিব্বতে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরঞ্জিত তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে কিছু অ্যাকাউন্টের ওপর নজরদারি করছে পুলিশ।

তথ্য গোপনের অভিযোগ নাকচ চীনের

বন্যার ভয়াবহতা নিয়ে তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতার প্রশ্নও উঠেছে চীনের বিরুদ্ধে। শনিবার বিবিসি জানিয়েছিল, নেপাল ও তিব্বতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তপথ গিরং বন্দরের ওপর দিয়ে ভয়াবহ পানির স্রোত বয়ে যাওয়ার দৃশ্য চীনে সেন্সর করা হয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় প্রধান সংবাদ বুলেটিনে এখন পর্যন্ত ওই ঘটনার একটি স্থিরচিত্রই সম্প্রচার করা হয়েছে বলে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়।

তবে এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে চীন। সোমবার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, দুর্যোগ পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য “খোলাখুলি, স্বচ্ছভাবে এবং সময়মতো” প্রকাশ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম “জরুরি কিন্তু সুশৃঙ্খলভাবে” পরিচালিত হচ্ছে। দুর্যোগকে ব্যবহার করে চীনের বিরুদ্ধে “বিদ্বেষপূর্ণ অপপ্রচার” চালানো বা পরিস্থিতিকে চাঞ্চল্যকরভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা জনগণের সমর্থন পাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বন্যার পর নেপাল ও তিব্বতের দুর্গম এলাকাগুলোতে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্গম টানেল, ধসে পড়া পাহাড় ও বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে পৌঁছে জীবিতদের খুঁজে বের করা।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে