কুড়িগ্রামের চিলমারীতে বৃষ্টির ঘাটতি ও গরম আবহাওয়ার কারণে আমন ধানের জমিতে সেচের প্রয়োজন বাড়ছে। দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় অনেক জমির মাটি শুকিয়ে ফেটে গেছে। এতে আমন ধানের বৃদ্ধি ও ফলন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। চলতি মৌসুমে চিলমারী উপজেলায় প্রায় ৭ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে আমন ধান রোপণ করা হয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিসের হিসাবে, এর প্রায় ৫০ শতাংশ জমির পানি শুকিয়ে গেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিকের তুলনায় কতটা অস্বাভাবিক, তা বুঝতে সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাতের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ০১ আগস্ট থেকে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত কুড়িগ্রাম জেলায় মোট ১১৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ সময়ে গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গড় আপেক্ষিক আর্দ্রতা ছিল ৮১শতাংশ। আর্দ্রতা বেশি থাকলে ঘাম সহজে শুকায় না। ফলে শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ বাধাগ্রস্ত হয় এবং একই তাপমাত্রাতেও বেশি গরম অনুভূত হতে পারে। চাষিরা এখন কী করবেনঃ জমিতে পানির ঘাটতি দেখা দিলে কী করতে হবে, সে বিষয়ে কৃষকদের পরামর্শ দিয়েছে উপজেলা কৃষি অফিস। কর্মকর্তারা বলছেন, জমিতে ফাটল তৈরি হতে দেওয়া যাবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দিয়ে মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা ধরে রাখতে হবে। ভেজা ও শুকনা পদ্ধতিতে পর্যায়ক্রমে সেচ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যেসব কৃষকের নিজস্ব সেচের ব্যবস্থা নেই, তাঁরা স্থানীয়ভাবে সমন্বয় করে পালাক্রমে সেচ দিতে পারেন। প্রয়োজনে শ্যালো ইঞ্জিন বা বৈদ্যুতিক পাম্প ব্যবহার করে পানির ব্যবস্থা করতে হবে। তবে দুপুরের তীব্র গরমে সেচ না দিয়ে ভোরে অথবা বিকেলের পর পানি দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা। এতে অতিরিক্ত তাপে পানি দ্রুত বাষ্পীভূত হওয়ার পরিমাণ কমতে পারে। বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলে সেচের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস নজরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। বৃষ্টি কম কেনঃ আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক শামছুদ্দোহা বলেন, মৌসুমি অক্ষরেখা বাংলাদেশের দক্ষিণে অবস্থান করা এবং মৌসুমি বায়ু তুলনামূলক কম সক্রিয় থাকায় কুড়িগ্রামসহ রংপুর বিভাগে বৃষ্টিপাত কম হচ্ছে। বাতাসে জলীয় বাষ্প বেশি থাকলে ঘাম দ্রুত শুকাতে পারে না। ফলে শরীরের স্বাভাবিক শীতল হওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় এবং মানুষের বেশি গরম অনুভূত হয়। তবে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় বৃষ্টি কম হওয়া বা গরম বেশি অনুভূত হওয়াকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলা যায় না। এ ধরনের ঘটনার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বুঝতে দীর্ঘমেয়াদি তথ্য ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। বৃষ্টির সম্ভাবনা ও ধানচাষে প্রভাব কতটাঃ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২৯ তারিখ থেকে পরবর্তী ০৫ দিন কুড়িগ্রামসহ রংপুর বিভাগের অনেক জায়গায় হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সাথে কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী বর্ষণ হতে পারে। তবে বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেই জমির পানির ঘাটতি পুরোপুরি মিটবে না। বৃষ্টির পরিমাণ, কতক্ষণ বৃষ্টি হচ্ছে এবং পরবর্তী কয়েক দিনের তাপমাত্রার ওপর পরিস্থিতি অনেকটা নির্ভর করবে।চিলমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কনক চন্দ্র রায় বলেন, ধানের বৃদ্ধি পর্যায়ে পানির ঘাটতি হলে গাছের বৃদ্ধি কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে কুশির সংখ্যা কমে যেতে পারে এবং আগাছার পরিমাণ বাড়তে পারে। থোড় পর্যায়ে পানির ঘাটতি হলে শীষের দৈর্ঘ্য কমে যেতে পারে এবং চিটা বাড়তে পারে। এতে ফলন কমার ঝুঁকি থাকে। রমনা ইউনিয়নের কৃষক মাজেদুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বাড়তি খরচের কারণে সেচ দেওয়া তাঁদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। “সময়মতো পানি দিতে না পারলে ধানের গাছগুলো নষ্ট হয়ে যেতে পারে,” তিনি বলেন। আরেক কৃষক আইজল বলেন, কয়েকদিন ধরে বৃষ্টির অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা। “আকাশে মেঘ দেখা যাচ্ছে না। ধারদেনা করে ধান লাগিয়েছি। এখন পানি নিয়ে চিন্তায় আছি,” তিনি বলেন। গরম কতটা বাড়ছেঃ রংপুর বিভাগের তাপমাত্রার দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা নিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ২০২৪ সালে প্রকাশিত ৩৯ চেঞ্জিং ক্লাইমেট অব বাংলাদেশ ৩৯ শীর্ষক এর গবেষণায় ১৯৮০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে বর্ষাকালে (জুন-সেপ্টেম্বর) প্রতি দশকে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস করে বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে একটি নির্দিষ্ট সময়ের বৃষ্টিহীনতা বা গরমকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফল হিসেবে চিহ্নিত করতে আলাদা বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টির ধরনে পরিবর্তন এবং চরম আবহাওয়ার প্রবণতা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চিলমারীর কৃষকদের জন্য আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আগামী কয়েক দিনে কতটা বৃষ্টি হয় এবং সেই বৃষ্টি জমির পানির ঘাটতি কতটা পূরণ করতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দেওয়া এবং স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুসরণ করাই এখন সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।