দুর্নীতির ১৫ মামলায় খালাস পেলেন মির্জা আব্বাস

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ০২:৪৪ পিএম
দুর্নীতির ১৫ মামলায় খালাস পেলেন মির্জা আব্বাস
ছবি: সংগৃহীত

বিনা দরপত্রে ১৮টি সরকারি পরিত্যক্ত বাড়ি বিক্রিতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা ১৫টি মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) মির্জা আব্বাসসহ ২১ আসামিই খালাস পেয়েছেন। ১২৭ কোটি ৬৪ লাখ ১৯ হাজার ৫৯ টাকা দুর্নীতির অভিযোগে ২০০৭ সালে দায়ের হওয়া দীর্ঘদিনের এসব মামলার রায় বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩ ঘোষণা করেন।

আদালতের বিচারক মুহাম্মদ কামরুল হাসান খান সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে এ রায় দেন। মির্জা আব্বাসের আইনজীবী মো. শাহীনুর ইসলাম ও মহিউদ্দিন চৌধুরী রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, “১৫ মামলায় সব আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে। তবে বিচার চলাকালে তিন আসামি মারা গেছেন। রায়ে আমরা ন্যায় বিচার পেয়েছি।”

মামলা সূত্রে জানা যায়, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে রাজধানীর অভিজাত এলাকায় সরকারি ১৮টি পরিত্যক্ত বাড়ি বিনা দরপত্রে বিক্রির অভিযোগে ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ মির্জা আব্বাসসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে মতিঝিল থানায় মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগ ছিল, বাড়িগুলো অস্বাভাবিক কম দামে বিক্রি করে আসামিরা আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন এবং এতে সরকারের ১২৭ কোটি ৬৪ লাখ ১৯ হাজার ৫৯ টাকা ক্ষতি হয়েছে।

মামলার তদন্ত শেষে ওই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। অভিযোগপত্রে মির্জা আব্বাসসহ প্রাথমিকভাবে মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে সরকারি বাড়ি বিক্রিতে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। পরে আরও ১৪ জনের নাম অভিযোগপত্রে যুক্ত করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে ‘সুবিধা আদায়ের’ অভিযোগ তোলা হয়। পরবর্তীতে মির্জা আব্বাসসহ ২১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, গুলশান, ধানমন্ডি ও শান্তিনগরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় থাকা মোট ১৮টি পরিত্যক্ত বাড়ি বিক্রির ক্ষেত্রে অনিয়ম করা হয়। বাড়িগুলোর মধ্যে গুলশানের এনডব্লিউ (আই)-৬, রোড-৫৩, কে-৬, সড়ক-৮৯, সিএনজি-১৬, সড়ক-১১৩ এবং বি-৫, সড়ক-১১৩ উল্লেখযোগ্য। ধানমন্ডির ১২০, সড়ক-২, ১৩৯, সড়ক-২, ৫৪০/এ, সড়ক-১২, ৫৪০/বি, সড়ক-১২, ৭২৩/এ, সড়ক-১৪ এবং ৭২৩/বি, সড়ক-১৪ নম্বর বাড়িও তালিকায় ছিল। এছাড়া ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ১৭ ও ১৮ নম্বর কলেজ স্ট্রিট এবং শান্তিনগরের নওরতন কলোনির ৭/১ নম্বর বাড়িও ছিল।

দুদকের অভিযোগ ছিল, এসব বাড়ি বিক্রির ক্ষেত্রে প্রকৃত মূল্য বিবেচনায় না নিয়ে অস্বাভাবিক কম দামে বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়। অভিযোগে সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে বাড়িগুলো বিক্রির অনুমোদন দেওয়ার কথা বলা হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের দেওয়া বেশি দামের প্রস্তাব আমলে না নিয়ে কম মূল্যের দরপত্রের ভিত্তিতে বাড়িগুলো বিক্রির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।

মামলায় মির্জা আব্বাসসহ অপর আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) এবং দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধের অভিযোগ আনা হয়।

মামলার বিচার চলাকালে আদালত ২৪ সাক্ষীর মধ্যে ২৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেন। দীর্ঘ বিচারিক কার্যক্রম শেষে বৃহস্পতিবার আদালত আসামিদের অভিযোগ থেকে খালাস দেন।

এই ১৮টি বাড়ি নিয়ে পৃথক ১৫টি মামলা করা হয়েছিল। মামলার নথি অনুযায়ী, পাঁচ আসামির পৃথক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সাতটি মামলা বাতিল করে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিলেন, তার বিরুদ্ধে দুদক সাতটি আবেদন করে। ওই পাঁচজন হলেন বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান, রাজউকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ইমদাদুল ইসলাম, একম ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেহেদী হাসান, চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা আফছার উদ্দিন আহম্মেদের স্ত্রী হাসনা আহমেদ এবং এস এম আনোয়ার হোসেন।

এ ছাড়া মামলার বৈধতা নিয়ে করা হাইকোর্টের আবেদন খারিজের বিরুদ্ধে বায়রার আলী হায়দার চৌধুরী লিভ টু আপিল করেন। এসব আবেদনের ওপর শুনানি হয় এবং আলী হায়দারের লিভ টু আপিল খারিজ হয়ে যায়।

মামলায় মির্জা আব্বাসসহ ১২ জনকে প্রত্যেকটি মামলায় আসামি করা হয়েছিল। তারা হলেন এস এম জাফর উল্লাহ, মো. এমদাদুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলী, গোলাম নবী, কাজী রিয়াজুল মনির, জিয়াউদ্দিন আহমেদ, আব্দুস সাদেক, হুমায়ন খান, মীর মোশাররফ হোসেন, ইকবাল উদ্দিন চৌধুরী ও মো. শহীদ আলম। এর বাইরে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও আহমেদ আকবর সোবহানকে দুটি করে মামলায় এবং মেহেদী হাসান, শফিকুর রহমান কিরন, নুরুচ্ছাফা, মো. শুকুর মিয়া, হাসনা আহমেদ ও আলী হায়দার চৌধুরীকে পৃথক মামলায় আসামি করা হয়। বৃহস্পতিবারের রায়ে তারা সবাই খালাস পেয়েছেন।

মির্জা আব্বাসের আইনজীবীদের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, বর্তমানে তিনি মালয়েশিয়ার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এর আগে ১১ মার্চ ইফতারের সময় হঠাৎ জ্ঞান হারালে তাকে রাজধানীর বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নিউরো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল টিম তার মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করে।

পরে ১৫ মার্চ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রায় এক মাস চিকিৎসার পর তিনি অনেকটা সুস্থ হয়ে ওঠেন। চিকিৎসকদের পরামর্শে ফিজিওথেরাপির জন্য পরে তাকে মালয়েশিয়ার প্রিন্স কোর্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিছুদিন আগে তার সহধর্মিণী আফরোজা আব্বাস জানিয়েছিলেন, তিনি সেখানে অনেকটা সুস্থ বোধ করছেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে