নীরব সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

এফএনএস | প্রকাশ: ২১ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:৫৭ পিএম
নীরব সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত সাম্প্রতিক তথ্য বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য খাতের একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা সামনে এনেছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ (২০১৮-১৯) অনুযায়ী, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের ১৬.৮ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ১২.৬ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। এর মধ্যে ৯২ শতাংশেরও বেশি মানুষ চিকিৎসাসেবার বাইরে রয়েছেন। একই সঙ্গে প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে মাত্র ১.১৭ জন মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী এবং সরকারি খাতে নিবন্ধিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা প্রায় ৩৫০-এই পরিসংখ্যান স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি বড় সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত দেয়। মানসিক রোগ সবসময় দৃশ্যমান নয়, কিন্তু এর প্রভাব ব্যক্তি, পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর সুদূরপ্রসারী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে যে, বিষণ্নতা, উদ্বেগসহ বিভিন্ন মানসিক ব্যাধি মানুষের কর্মক্ষমতা হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। ফলে মানসিক স্বাস্থ্যকে আর কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি জনস্বাস্থ্য ও উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সরকার ইতোমধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৮ প্রণয়ন, জাতীয় কৌশলপত্র বাস্তবায়ন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা যুক্ত করা, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, আত্মহত্যা প্রতিরোধ কর্মসূচি এবং টেলিমেডিসিন সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এসব পদক্ষেপ ইতিবাচক হলেও বাস্তব চাহিদার তুলনায় সেবার পরিধি এখনও সীমিত। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী এবং সহজলভ্য সেবার ঘাটতি স্পষ্ট। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে কেবল অবকাঠামো বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানসিক রোগ নিয়ে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা দূর করা। অনেক মানুষ লজ্জা, ভয় কিংবা সামাজিক কুসংস্কারের কারণে চিকিৎসা নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। ফলে রোগ জটিল আকার ধারণ করে এবং ব্যক্তি ও পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং কমিউনিটি পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা তাই সময়ের দাবি। একটি সুস্থ ও উৎপাদনশীল সমাজ গঠনে শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক সুস্থতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। প্রয়োজন জনবল বৃদ্ধি, বাজেট বরাদ্দ সম্প্রসারণ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আরও কার্যকরভাবে সংযুক্ত করা এবং সেবার সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। মানসিক স্বাস্থ্যকে উন্নয়ন নীতির মূলধারায় স্থান দিতে পারলেই এই নীরব সংকট মোকাবিলায় টেকসই অগ্রগতি সম্ভব হবে।