বাংলাদেশের পাহাড় শুধু একটি প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতি নয়; এটি জীববৈচিত্র্য, পরিবেশের ভারসাম্য এবং দুর্যোগ মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। অথচ বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে পাহাড় কাটার ঘটনা বছরের পর বছর ধরে চলমান। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় সম্প্রতি আবারও পাহাড় কাটার অভিযোগ পত্রিকার পাতায় উঠে এসেছে, যা পরিবেশ সুরক্ষায় বিদ্যমান ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। প্রকাশিত খবরাখবর অনুযায়ী, রাতের আঁধারে পাহাড় কেটে মাটি ইটভাটা ও বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। এ সময় পাহাড়ের গাছপালাও উজাড় করা হচ্ছে, ফলে পরিবেশ ও প্রতিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বন বিভাগের মালিকানাধীন পাহাড় থেকেও মাটি কাটার অভিযোগ রয়েছে। যদিও উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে তারা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে এবং অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে একটি ট্রাক জব্দের ঘটনাও ঘটেছে। তবে অভিযোগের পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে, বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে এ সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। অবৈধ পাহাড় কাটার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় পরিবেশে। এতে ভূমিধসের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়, প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ ব্যাহত হয়, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয় এবং স্থানীয় জলবায়ুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে বর্ষাকালে পাহাড় ধসের কারণে অতীতে বহু প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। তাই পাহাড় রক্ষার বিষয়টি কেবল পরিবেশগত নয়, জননিরাপত্তার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আইন অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া পাহাড় কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু যদি রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি বা সমন্বয়হীনতার কারণে অপরাধীরা বারবার একই কাজ করতে সক্ষম হয়, তাহলে আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তাই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা এবং পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত তৎপরতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়কে অর্থ উপার্জনের উৎস নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। পরিবেশবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অবৈধ মাটি বাণিজ্যের চাহিদা কমানোর দিকেও নজর দিতে হবে। প্রকৃতি ধ্বংস করে উন্নয়ন কখনো টেকসই হতে পারে না। পাহাড় কাটা বন্ধে নিয়মিত নজরদারি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাহাড় রক্ষা করা মানে কেবল একটি ভূখণ্ড সংরক্ষণ নয়; বরং মানুষের জীবন, পরিবেশ এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা রক্ষা করা।