আবহমানকাল থেকে বাংলার ঐতিহ্যের অন্যতম আনন্দ উদ্ধেল নৌকা বাইচ। আবেগ-উত্তেজনার মধ্য দিয়ে নৌকা বাইচ হয়ে ওঠে আপামর মানুষের নির্মল অন্তরে বয়ে যায় আনন্দের বন্যা।
নদীমাতৃক বাংলাদেশ। এদেশে নদীর তরঙ্গভঙ্গের সঙ্গে মাটি ও মানুষের শৈশব মিতালি জড়িত। নদীবক্ষে নৌকা শুধু যোগাযোগের মাধ্যমই নয় বরং নদী হয়ে উঠেছে এখানে মানুষের গুরুত্বপূর্ণ প্রাণোচ্ছল ক্রীড়াসঙ্গী। এই প্রেক্ষাপটে, হয়ে উঠেছে একটি দৃষ্টিনন্দন রোমাঞ্চময় দৃষ্টান্ত।
‘বাইচ’ শব্দটি ফরাসী। ফরাসীদের সময় এই খেলার উৎপত্তি হলেও এর আধুনিক ছোঁয়া লাগে ব্রিটিশদের সময়। পরে ছড়িয়ে পরে ভারতবর্ষে। সর্বত্র জনপ্রিয় হতে থাকে খেলাটি। সেই ধারাবাহিকতায় এই জনপদে নৌকা বাইচ আমজনতার জনপ্রিয় প্রতিযোগিতা হিসেবে স্থান করে নেয়।
বাংলাদেশের প্রাচীন ঐতিহাসিক খেলাগুলোর মধ্যে নৌকা বাইচ অন্যতম। প্রাপ্ত রেকর্ড অনুযায়ী ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২০০০ বছর আগে ‘মেসোপটেমিয়ার’ লোকেরা ইউফ্রেটিস নদীতে এক ধরনের নৌকা বাইচের আয়োজন করত। এর কয়েক শতাব্দী পর মিসরের নীল নদের জলে নৌকা প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এর পর ছড়িয়ে পড়তে থাকে এর প্রসার। অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা এখনও ব্যাপক জনপ্রিয়। ১৯০০ সাল থেকে অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় এ পর্যন্ত প্রায় ১৩৫টি ফাইনাল হয়েছে। তার মধ্যে ২৬ বার যুক্তরাষ্ট্র, ২৫ বার জার্মানি এবং ১৪ বার যুক্তরাজ্য বিজয়ী হয়েছে।
এদেশে নৌকা বাইচ গণবিনোদন হিসেবে কবে প্রচলন হয়েছিল তার সঠিক কোন ইতিহাস পাওয়া না গেলেও তিনটি বিষয়ে জনশ্রুতি রয়েছে। প্রথমতঃ- অনেকে মনে করেন, মুসলিম যুগে নবাব-বাদশাহদের আমলে নৌবাহিনী গঠিত থেকেই নৌকা বাইচের যাত্র শুরু হয়ে ছিল। প্রতি বৎসর নৌবাহিনীর মহড়া কে কেন্দ্র করে দিন দিন নবাব বাহাদুরদের কাছে নৌকা বাইচ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে।
দ্বিতীয়তঃ-হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যে জনশ্রুতি রয়েছে জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রাকে কেন্দ্র করে নৌকা বাইচের যাত্র শুরু হয়েছিল।জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রার সময় স্নানার্থীদের নিয়ে বহু নৌকার ছড়াছড়ি ও দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়।এতেই মাঝি-মাল্লা-যাত্রীরাসহ দর্শনার্থীরা প্রতিযোগিতার আনন্দ পায়। এ থেকে কালক্রমে নৌকা বাইচ শুরু হয়ে ছিল বলে মনে করেন। তৃতীয়তঃ- ১৮ শতকের গোড়ার দিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের তৎকালিন গাজী পীর মেঘনা নদীর এক পাড়ে দাঁড়িয়ে অন্য পাড়ে থাকা তার ভক্তদের কাছে আসার আহ্বান জানান। সে সময় ভক্তরা তার কাছে আসতে একটি ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে মাঝ নদীতে এসে পৌছায় ঠিক তখন নদী ফুলেফেঁপে উঠে। দূর্ঘটনার আশংকার খবর পেয়ে চারপাশে যত নৌকা ছিল তারা সকলেই ছুটে আসতে থাকে। একপর্যায়ে সারি সারি নৌকা এসে অন্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলে। এ থেকেই নৌকা বাইচের যাত্রা শুরু হয়ে ছিল বলে অনেকেই মতপোষন করে থাকেন।
প্রমত্তা নদের বক্ষে সঙ্গীতের-তাল-লয়ে দাঁড়ীদের ছন্দময় দাঁড় নিক্ষেপে নদীজল আন্দোলিত করে যে মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের অবতারণা হয় তা অতুলনীয়। মাঝিদের একত্র জয়ধ্বনিতে এবং একই লয়ের গানের তালে, ঝোকে ঝোকে বৈঠার টানে এক সঙ্গে পানিতে এক অপূর্ব অভিঘাতের ছলৎ ছলৎ শব্দ সৃষ্টি হতে থাকে।
জামালপুর জেলার ইসলামপুর ঐতিহ্য রক্ষার্থে প্রতিবৎসর এই জনপদের হারানো ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। আয়োজকরা রেকর্ড পরিমাণ দর্শক সমাগম হওয়ার কারণে প্রতিবছর এই উৎসব করে থাকেন। তারই ধারবাহিকতায় ১৯আগষ্ট/২৬ অনুষ্ঠিত হয়েছে উপজেলার গোয়ালেরচর ইউনিয়নে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে নৌকা বাইচ। ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সেলিম মাস্টার এর সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন আলকাছুর রহমান বিল্লাল বিশেষ অতিথি ছিলেন কাজল মৃধা ও গোয়ালেরচরের চেয়ারম্যান আব্দুর রহিম বাদশা। এসময় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রদল,যুবদলসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গরা উপস্থিত ছিলেন। খেলায় প্রথম স্থান অধিকার করেন গোয়ালেচর ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর গ্রামের আশার আলো দ্বিতীয় স্থান অধিকারকরেন উপজেলার চড় গোয়ালিনী ইউনিয়নের কান্দারচর গ্রামের আনন্দ তরী সংগঠন এবং তৃতীয় স্থান দখল করেন বকশীগঞ্জ উপজেলার নিলোক্ষিয়া গ্রামের একতা সংঘ। পরে প্রধান অতিথি প্রথম পুরস্কার হিসাবে একটি মোটরসাইকেল দ্বিতীয় পুরস্কার একটি গরু এবং তৃতীয় পুরস্কার একটি এলইডি টিভি বিজয়ীদের মাঝে প্রদান করেন।