একটি পরিকল্পিত নগর গড়ে ওঠে সুশৃঙ্খল নগর পরিকল্পনা, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং দায়িত্বশীল তদারকির ওপর। কিন্তু চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক বাস্তবতা-গত ১৫ বছরে অনুমোদিত প্রায় ৩০ হাজার ভবনের মধ্যে ৯৯ শতাংশই অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি। এটি শুধু নির্মাণবিধির লঙ্ঘন নয়; বরং নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ ও জননিরাপত্তার জন্যও একটি বড় হুমকির ইঙ্গিত। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা গেছে, কোথাও অনুমোদনের চেয়ে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ করা হয়েছে, কোথাও রাস্তা ও উন্মুক্ত স্থান দখল করা হয়েছে, আবার অনেক ভবনে বাধ্যতামূলক পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়নি। এমনকি পাহাড়, ড্রেন ও নালার ওপর ভবন নির্মাণের ঘটনাও ঘটেছে। এসব অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চললেও কার্যকর তদারকি ও আইন প্রয়োগের অভাবে তা প্রায় স্বাভাবিক চিত্রে পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, যদি ৯৯ শতাংশ ভবনই নকশাবহির্ভূতভাবে নির্মিত হয়ে থাকে, তবে তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থা এতদিন কী ভূমিকা পালন করেছে? ভবন নির্মাণের প্রতিটি ধাপে নিয়মিত পরিদর্শন এবং আইন লঙ্ঘনের শুরুতেই ব্যবস্থা নেওয়া হলে পরিস্থিতি এতটা জটিল হওয়ার কথা নয়। একটি ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হতে দীর্ঘ সময় লাগে; ফলে নির্মাণ শেষ হওয়ার পর অনিয়ম শনাক্ত করার চেয়ে নির্মাণকালেই নজরদারি বেশি কার্যকর। সিডিএ এখন নকশাবহির্ভূত ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং নিয়ম না মানলে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ না দেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপের কথা বলছে। এই উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা ও নিরপেক্ষতার ওপর। অতীতে বিভিন্ন কারণে আইন প্রয়োগে শিথিলতা এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবের অভিযোগ ছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার যেন কোনো ধরনের বৈষম্য বা প্রভাবের সুযোগ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নগর পরিকল্পনাকে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিতে এগিয়ে নেওয়া জরুরি। দ্রুত নগরায়ণের চাপ মোকাবিলায় পরিকল্পিত স্যাটেলাইট টাউন, উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো এবং আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন সময়ের দাবি। নগর উন্নয়ন শুধু নতুন ভবন নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি নাগরিকদের নিরাপদ, বাসযোগ্য ও টেকসই জীবন নিশ্চিত করারও বিষয়। চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক নগরী। তাই এ নগরীর উন্নয়নও হতে হবে পরিকল্পিত ও আইনসম্মত। অনুমোদিত নকশা উপেক্ষা করে নির্মাণের সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা, যানজট, অগ্নিঝুঁকি ও পরিবেশগত সংকট আরও প্রকট হবে। এখন প্রয়োজন নিয়ম ভঙ্গের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক তদারকি এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ। তবেই একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নান্দনিক চট্টগ্রাম গড়ে তোলার লক্ষ্য বাস্তব রূপ পাবে।