কালীগঞ্জের

এমপি আনার অপহরণ মামলা থেকে হত্যা মামলায় রুপান্তর হয়নি

এফএনএস (টিপু সুলতান; কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ) : | প্রকাশ: ৮ আগস্ট, ২০২৬, ০২:৩৩ পিএম
এমপি আনার অপহরণ মামলা থেকে হত্যা মামলায় রুপান্তর হয়নি

ফ্যাসিষ্ট আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে ২০২৪ সালের ১৩ মে ভারতের অভ্যন্তরে কলকাতায় নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছিলেন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার। সেসময় এই হত্যাকান্ডের ঘটনাটি দেশব্যাপী ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়ে উঠে। দেশী বিদেশী মিডিয়ায় আনারের সংসদ সদস্য থেকে দক্ষিনাঞ্চলের শীর্ষ মাফিয়া ডন হয়ে উঠার খবর প্রচার হতে থাকে। হত্যার তদন্তে নেমে খুলনা অঞ্চলের শীর্ষ চরমপন্থী নেতা আমানুল্লাহ ওরফে শিমুল ভূঁইয়া,তার ভাতিজা তানভীর ভূঁইয়া,যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আকতারুজ্জামান শাহীনের বান্ধবী শিলাস্তি রহমানকে আটক করে গোয়েন্দো পুলিশ। এরপর গোয়েন্দা পুলিশের হাতে আটক হয় ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু ও আওয়ামী লীগ নেতা কাজী কামাল আহমেদ ওরফে গ্যাস বাবু, খাগড়াছড়ির পাহাড় থেকে আটক হয় ভাড়াটে খুনি ফয়সাল ও মুস্তাফিজ। ভারত ও নেপালে গ্রেফতার হয় যথাক্রমে জিহাদ ও সিয়াম। আটককৃতরা বর্তমানে কারাগারে আটক রয়েছে।

গ্যাস বাবুর স্বীকরোক্তি কলকাতায় সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার হত্যার ঘটনায় একই বছরের ৬ জুন চরমপন্থি নেতা শিমুল ভূঁইয়ার নিকট আত্মীয় ঝিনাইদহের আওয়ামী লীগ নেতা কাজী কামাল আহম্মেদ বাবু

ওরফে ‘গ্যাস বাবু’ আটক হয়। বাবুর স্বীকারোক্তি মোতাবেক গ্রেফতার হন ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু। ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী এই দুই নেতা গ্রেফতারের পর আনার হত্যার মোটিভ ও ক্লু উদ্ধারে নতুন করে মাঠে নামে ঢাকা মহানগর গোয়ন্দো পুলিশ। জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক গ্যাস বাবুকে মোবাইল উদ্ধারের নামে ঝিনাইদহে আনা হয়। ২৬ জুন হেলিকপ্টারে ঝিনাইদহে উড়ে আসেন তৎকালীন ডিবি প্রধান ও বর্তমানে পলাতক হারুন অর রশিদ। ঝিনাইদহ শহরে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে দুইটি পুকুরে ডুবুরী নামিয়ে নিষ্ফল অভিযান চালানো হলে ওই দিনই বিকালে খাগড়াছড়ি থেকে আনার হত্যার সন্দেহভাজন আসামি মোস্তাফিজুর ও ফয়সালকে গ্রেফতার করা হয়। এমপি আনার খুন হওয়ার আগে তারা ২৪ সালের ২ মে কলকাতায় যান। দেশে ফিরে আসেন ১৯ মে। এই দুজনের বাড়ি খুলনার ফুলতলা এলাকায়। খুনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী হিসেবে চিহ্নিত শিমুল ভূঁইয়ার বাড়িও একই এলাকায়।

দ্বন্দ শুরু যে কারনে

২০১৪ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ঝিনাইদহের স্বর্ণ চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণ ধাপে ধাপে নেয়া শুরু করেছিলেন আনার। এই নিয়ে যশোর ও খুলনার প্রভাবশালী কতিপয় ব্যক্তি নাখোশ ছিলেন আনারের উপর। খুলনার এক প্রভাবশালী গডফাদারের কাছে আনার চোরাচালানের রুট ফি হিসেবে কয়েক’শ কোটি টাকা দাবী করেন। অন্যথায় স্বর্ণের চালান আটকে দেবার হুমকি দিয়েছিলেন প্রয়াত এই সংসদ সদস্য। ১২ মে চিকিৎসার জন্য ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থেকে ভারতে গমন করেন এমপি আনার। উঠেন পশ্চিমবঙ্গে বরাহনগর থানার মন্ডলপাড়া লেনে গোপাল বিশ্বাস নামের এক বন্ধুর বাড়িতে।তিনি চিকিৎসক দেখানোর কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন। তারপর থেকেই রহস্যজনক ভাবে নিখোঁজ ছিলেন আনোয়ারুল আজিম আনার। ২২ মে হঠাৎ খবর পাওয়া যায় কলকাতার পার্শ্ববর্তী নিউটাউন এলাকায় সঞ্জীবা গার্ডেন নামের একটি আবাসিক ভবনের বিইউ ৫৬ নম্বর রুমে আনোয়ারুল আজিম আনার খুন হয়েছেন। তবে ফ্লাটে পাওয়া যায়নি কোন মরদেহ। পরে কলকাতা পুলিশ অভিযান চালিয়ে সঞ্জিবা গার্ডেনের সেপটিক ট্যাংক থেকে প্রায় চার কেজি মানুষের মাংস উদ্ধার করে।

মাছের মায়ের পুত্র শোক

ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার আনার হত্যার পর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু কালীগঞ্জে গিয়ে আনারের শোকাহত স্ত্রী-কন্যাকে শান্তনা দেন। মিন্টুকে আটকের পর আনারের কন্যা মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন তার পরিবারের সঙ্গে মিন্টুর দেখা করার ঘটনাকে মাছের মায়ের পুত্র শোক বলে অভিহিত করেছিলেন।

ডিএনএর টেষ্টের মিল

নিহত এমপি আনারের মেয়ে ডরিনের সাথে ভারতের মিডিয়ায় সেপটিক ট্যাংক থেকে উদ্ধার হওয়া মাংসের টুকরার ডিএনএ টেষ্টের রিপোর্ট মিলে যাওয়ার খবর প্রচারিত হয়। ফলে ঝিনাইদহ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল আজিম আনারকে হত্যা করা হয়েছে মর্মে প্রমানিত হয়। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের উদ্ধার করা মাংস ও হাড়ের সঙ্গে তার মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিনের ডিএনএর মিল পাওয়া যায় মর্মে সেদেশের সিআইডি বিবৃতি দিয়েছিলো।

ইন্টারপোলের মোষ্ট ওয়ান্টেড

আনারের বিরুদ্ধে অস্ত্র, বিস্ফোরক, মাদকদ্রব্য ও স্বর্ণ চোরাচালান, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি এবং চরমপন্থিদের আশ্রয় দেয়ার অভিযোগে ২১টির অধিক মামলা ছিল দেশের বিভিন্ন থানায়। রাজনৈতিক বিবেচনায় তাকে সেসব মামলা থেকে অব্যহতি দেয় সরকার। আনোয়ারুল আজিম আনারের পৈতৃক বাড়ি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের মধুগঞ্জ বাজার এলাকায়। তিনি কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে পর পর তিনবার আওয়ামী লীগ থেকে তিনি এমপি নির্বাচিত হন। অভিযোগ রয়েছে এক সময়ের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের চরমপন্থিদের নিয়ন্ত্রণকর্তা ছিলেন আনার। অস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্য পাচারের হোতা হিসেবেও পুলিশের খাতায় নাম ছিল আনারের।

মাদক ও স্বর্ন ব্যবসা

১৯৮৬ সালের দিকে জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় থাকাকালে আনার মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন। ভারতের বাগদা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের বাঘাভাঙ্গা সীমান্ত পথে চোরাচালানী পন্য ওধার এধার করতেন আনার। সেসময় কালীগঞ্জ, মহেশপুর, কোটচাঁদপুর ও চুয়াডাঙ্গার জীবননগর থানা পুলিশের সঙ্গে মাসিক চুক্তিতে মাদক ও ভারতীয় পন্যের চোরাচালান করতেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। ১৯৯১ সালে আনার ঝিনাইদহের প্রয়াত স্বর্ন ব্যবসায়ী পরিতোষ ঠাকুরের সঙ্গে স্বর্ণ চোরাচালানের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। স্বর্ণের বড় বড় চালান রাজধানী থেকে বাঘাডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করতেন তারা। ১৯৯৬ সালে আনার বিএনপি থেকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ভারতের বাগদা এলাকার মাদক সম্রাট জয়ন্ত কুমার, কার্তিক, গৌতম সাহা ও বনগাঁর দেবদাসের সঙ্গে আনারের হটলাইন মাদক ও স্বর্ণ ব্যবসার চোরাই কারবার ছিল বলে জানিয়েছেন তার ঘনিষ্ঠজনরা।

২০০৭ সালে চুয়াডাঙ্গার লোকনাথপুর এলাকায় বিকেল বেলা গরুর গাড়ি থেকে ১২ কেজি ৯ ৫০ গ্রাম স্বর্ণ আটক করে তৎকালীন সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিডিআর। চোরাকারবারিরা নিশ্চিত হয় যে, দর্শনার সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সাইফুল ইসলাম স্বর্ণের চালান ধরিয়ে দিয়েছে। ওই ঘটনায় কয়েকদিন পরে রমজান মাসে আসরের নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে অজু করা অবস্থায় পিছন থেকে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে সন্ত্রাসীদের দ্বারা টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হন সাইফুল। কুষ্টিয়ার চরমপন্থি নেতা মুকুল, শাহীন রুমী, ঝিনাইদহের পরিতোষ ঠাকুর ও আনারসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।

সাইফুল হত্যা মামলায় আনারকে গ্রেফতারের জন্য ২০০৯ সালে পত্রিকায় গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছিলো চুয়াডাঙ্গার বিশেষ আদালত। ওই বছরের ২১ জানুয়ারি তাকে আটকের জন্য কালীগঞ্জ শহরের বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। ২০০৯ সালে আওয়ামীলীগ সরকার গঠন করার পর আনারের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো একে একে বাতিল হতে শুরু করে। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এমপির তকমায় পূর্বের সব মামলা থেকে রেহাই পেয়ে যান গডফাদার আনার।

সর্বশেষ পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

হত্যার ৮৭ দিনের মাথায় হত্যা মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয় কলকাতার সিআইডি। হত্যাকান্ডের পর নিহত আনারের কন্যা মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন ঢাকা শেরেবাংলা নগর থানায় একটি অপহরন মামলা দায়ের করেন। অথচ বাংলাদেশে আটক ৭ আসামির মধ্যে ৬ জন আদালতে স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দী দিলেও ডিএনএ রিপোর্ট সংগ্রহ করে অপহরণ মামলাটি হত্যা মামলায় রুপান্তরের উদ্যোগ নেয়নি। ইতিমধ্যেই একাধিকবার আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ পিছিয়েছে।

ঝিনাইদহ আদালতের পিপি এ্যাডভোকেট মশিউর রহমান জানিয়েছেন, মামলা হবার পর এখন দায়িত্ব পুলিশের। পুলিশ যদি তদন্তে ব্যর্থ হয় তবে পিবিআই আছে। সংশ্লিষ্টরা চাইলে সবই সম্ভব। তবে প্রতিবেদনের তারিখ যতই পিছিয়ে যাক না কেন একদিন না একদিন প্রতিবেদন আদালতে দিতেই হবে, এটাই আইন। তবে আলামত সংগ্রহ করে পুলিশ পারে মামলার তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নিতে।

ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা আবু তালিব জানান, যে কোন অপরাধের বিচার হওয়া উচিত। যদি কোন অপরাধের বিচার না হয় তাহলে জনমনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়, রাষ্ট্রে আইনের শাসন দূর্বল হয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরাই পারে এই স্পর্শকাতর হত্যার বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বিচারের বিকল্প নেই।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে