কক্সবাজারে বন্যা ও পাহাড়ধসে ২৬ প্রাণহানি, দুর্ভোগে তিন লাখের বেশি মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ১১ জুলাই, ২০২৬, ১২:৪২ পিএম
কক্সবাজারে বন্যা ও পাহাড়ধসে ২৬ প্রাণহানি, দুর্ভোগে তিন লাখের বেশি মানুষ
ছবি: সংগৃহীত

টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং পাহাড়ধসের কারণে কক্সবাজারে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত রোববার (৫ জুলাই) থেকে শুক্রবার (১০ জুলাই) পর্যন্ত পানিতে ডুবে ও পাহাড়ধসে ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলার অন্তত ১০টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের ১৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে তিন লাখের বেশি মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

শুক্রবার (১০ জুলাই) দুপুরে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে রসুলাবাদ এলাকার আবদুল মালেকের ১২ বছর বয়সী মেয়ে হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণার মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় তার দুই বোনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকেলে চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের মাইজ কাকারা এলাকায় পানিতে ডুবে দুই বছর বয়সী মোহাম্মদ ওয়াকিমের মৃত্যু হয়। একই দিন সকালে নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নে বন্যার পানিতে ভেসে মারা যায় তিন বছরের শিশু পুষ্প। ভোরে চকরিয়ার মছনিয়াকাটা এলাকায় পাহাড়ধসে বসতঘরের ওপর মাটি চাপা পড়ে একই পরিবারের দুই শিশুর প্রাণহানি ঘটে। এছাড়া কক্সবাজার সদর, পেকুয়া এবং উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৫ জন রোহিঙ্গাসহ আরও ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা। পাশাপাশি কক্সবাজার সদর, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও ঈদগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাও বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নূরুল ইসলাম বলেন, “বান্দরবান শহর থেকে পানি নামতে শুরু করায় মাতামুহুরী নদীর পানিও বেড়েছে। তাই চকরিয়া ও পেকুয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।”

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার, যিনি মাতামুহুরী উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বেও রয়েছেন, জানান, চকরিয়া ও মাতামুহুরী এলাকায় এক লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। ৯৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে দুর্গতদের শুকনো খাবারসহ জরুরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত এবং পানি দ্রুত নামাতে স্লুইস গেট সচল রাখতে প্রশাসন কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজাদ রহমান বলেন, শুক্রবার (১০ জুলাই) সন্ধ্যা পর্যন্ত সরকারি হিসাবে জেলায় ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬২ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ১৪ হাজার ৬১ জন। দুর্গতদের জন্য সরকারিভাবে ২০০ টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুমও চালু করা হয়েছে।

এদিকে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশের উত্তর পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের সাত জেলায় এখনো বন্যা পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে। যদিও গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা কমেছে, তবুও আগামী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় কক্সবাজারসহ দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতির সম্ভাবনা নেই। একই সঙ্গে ফেনী অঞ্চলে নতুন করে বন্যা দেখা দিতে পারে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আবদুল হান্নান বলেন, শুক্রবার (১০ জুলাই) রাত পর্যন্ত গত ছয় দিনে জেলায় ৭০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী দুই দিন মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। এতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি এবং নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে সমুদ্রবন্দর ও উপকূলীয় এলাকার জন্য স্থানীয় সতর্ক সংকেত নম্বর ৩ বহাল রাখা হয়েছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে