'সরকারি দপ্তর মানেই ভোগান্তি, দীর্ঘসূত্রতা আর দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য'Ñসাধারণ মানুষের হৃদয়ে গেঁথে থাকা এই পুরোনো ধারণা গুঁড়িয়ে দিতে কাজ শুরু করেছেন চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আনিসুর রহমান। অমায়িক আচরণ, চমৎকার কর্মদক্ষতা এবং মানবিক সেবার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে অতি অল্প সময়েই তিনি সাধারণ মানুষের মনে আস্থার জায়গা করে নিচ্ছেন।
চলতি বছরের অক্টোবর মাসে ফরিদগঞ্জে যোগ দেওয়ার পর থেকেই একটি জনবান্ধব, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ভূমিসেবাকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে মাঠে নেমেছেন এই নবাগত কর্মকর্তা। প্রশাসনিক কঠোরতার পাশাপাশি সেবার মানোন্নয়নে তিনি যুক্ত করেছেন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। নতুন জনবল আর নতুন পরিবেশ নিয়ে কাজের শুরুটা সহজ না হলেও চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেই এগোচ্ছেন তিনি।
যোগদানের পরপরই আইন প্রয়োগ ও জনস্বার্থ রক্ষায় বেশ কিছু জোরালো পদক্ষেপ নেন এই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। অবৈধ ড্রেজার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনাসহ বাজারের যানজট নিরসন, ফুটপাত দখলমুক্তকরণ ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ীদের সাথে সমন্বয় সভা করেছেন। পাশাপাশি ভূমিসেবায় ভোগান্তিহীন সরাসরি যোগাযোগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সাধারণ মানুষকে।
তবে কেবল দাপ্তরিক কাজ বা আইন প্রয়োগের গণ্ডিতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি। শিক্ষার্থীদের যুক্তিভিত্তিক চিন্তা ও সৃজনশীলতার বিকাশে আয়োজন করেছেন আন্তঃউপজেলা বিতর্ক উৎসব। যুবসমাজকে সামাজিক অবক্ষয় থেকে দূরে রেখে খেলাধুলা ও ইতিবাচক কাজে উদ্বুদ্ধ করার বিষয়টিকেও গুরুত্বের সাথে দেখছেন এই কর্মকর্তা।
ভূমি কার্যালয়ের পরিবেশ ও সেবার মান পরিবর্তন করাও তাঁর অন্যতম লক্ষ্য। পরিত্যক্ত গোলঘরটি সংস্কার করে পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব বিশ্রামাগার করা, কার্যালয় প্রাঙ্গণে বর্ণিল ফুলের বাগান তৈরি এবং সম্প্রসারিত রেকর্ড রুমের সংস্কার কাজ শুরু করা হয়েছে। এতে সেবাপ্রত্যাশীরা প্রয়োজনীয় কাজ শেষে একটি সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশ পাচ্ছেন।
কার্যালয় থেকে দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের চিরতরে নির্মূল করতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ যেন অসাধু চক্রের শিকার না হয়ে সরাসরি দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সেবা পেতে পারেন, সে বিষয়ে কঠোর তদারকি করছেন এসিল্যান্ড নিজে।
প্রশাসনিক কঠোরতার বাইরেও আনিসুর রহমানের মানবিক রূপ ফুটে উঠেছে আব্দুল মান্নান নামের এক বাক-শ্রবণপ্রতিবন্ধী এবং রহিমা বেগম নামের এক বিধবা নারীর ভূমিসেবা প্রদানে। কোনো অনভিপ্রেত ভোগান্তি ছাড়াই দ্রুগতি ও আন্তরিকতার সাথে সেবা পেয়ে আবেগাপ্লুত হন তাঁরা। সুবিধাবঞ্চিত ও অসহায় মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে তাঁর এই মানবিক উদ্যোগ অন্যান্য সরকারি দপ্তরগুলোর জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিজের লক্ষ্য ও কর্মপরিকল্পনা নিয়ে মো. আনিসুর রহমান বলেন, "ফরিদগঞ্জে এসিল্যান্ড হিসেবে এটিই আমার প্রথম কর্মস্থল। আমার আগের জেলা সদরের কাজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ফরিদগঞ্জকে একটি আধুনিক ও জনবান্ধব উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। সাধারণ মানুষের মনে ভূমি অফিস নিয়ে যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে, তা দূর করাই আমার প্রধান লক্ষ্য। সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং তা তদারকি করা হচ্ছে।"
নতুন জনবল ও নিত্যদিনের নানান সীমাবদ্ধতার মাঝেও আইন প্রয়োগে দৃঢ়তা, দাপ্তরিক সংস্কার এবং অমায়িক ব্যবহারের মাধ্যমে আনিসুর রহমান ফরিদগঞ্জ ভূমি অফিসে যে পরিবর্তনের সুর বেঁধেছেন, তাকে সাদরে গ্রহণ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সেবাপ্রত্যাশীরা। সাধারণ মানুষের এখন একটাই প্রত্যাশাÑএই জনবান্ধব ও মানবিক উদ্যোগগুলো যেন প্রতিনিয়ত আরও বেগবান হয়।