২০২০ সালে ইউনিসেফ বিশ্বজুড়ে সীসা দূষণে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে একটি তালিকা প্রকাশ করে। সেই তালিকায় বাংলাদেশকে বিশ্বের চতুর্থ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আন্তর্জাতিক এই রেঙ্কিং-এর পরও দেশে কোনো জাতীয় রক্ত পরীক্ষা কর্মসূচি চালু হয়নি। এমনকি এই দূষণের জন্য দায়ী শিল্পগুলোর বিরুদ্ধে বড় ধরনের কোনো আইনি বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপও নেওয়া হয়নি। সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এই প্রতিক্রিয়া বরাবরই ছিল সীমিত। তবে এই নীরবতার একটি চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংস্থা ‘পিওর আর্থ’-এর অর্থায়নে অর্থনীতিবিদ বিয়র্ন লারসেনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, কেবল ২০১৯ সালেই বাংলাদেশে সীসা দূষণজনিত কারণে স্বাস্থ্য খাতের মোট ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮.৬ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৬ থেকে ৯ শতাংশের সমতুল্য। শৈশবে সীসা দূষণের কারণে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা বা আইকিউ কমে যাওয়ার ফলে কর্মজীবনে যে উৎপাদনশীলতা নষ্ট হয়, তার বার্ষিক আর্থিক ক্ষতি প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশি শিশুদের রক্তে সীসার উপস্থিতির চিকিৎসাগত তথ্য (ক্লিনিক্যাল ডেটা) বিশ্লেষণ করলে যেকোনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একে ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ হিসেবে ঘোষণা করা যায়। সিসা শিশুর মানসিক ও বুদ্ধির বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে। তাদের আচরণগত সমস্যা হতে পারে। সিসার মাত্রা বেশি থাকলে শিশুর মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পেতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। সাতটি গবেষণার সম্মিলিত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যেসব শিশুর শরীরে সিসার মাত্রা বেশি, তাদের বুদ্ধিমত্তা অন্যদের তুলনায় কম। সিসার উপস্থিতি শিশুদের পড়াশোনার আগ্রহ, উদ্ভাবনী শক্তি এবং অন্য কাজে আগ্রহ কমিয়ে দিয়ে থাকে। এ ছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে, সিসা হৃদ্রোগজনিত অসুস্থতা (যেমন উচ্চ রক্তচাপ), হরমোনজনিত সমস্যা তৈরি করাসহ গর্ভবকালীন মা ও শিশুর ক্ষতি করতে পারে। গর্ভবতী মায়ের শরীরে সিসার উপস্থিতি থাকলে তাঁর অনাগত শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সিসার কারণে শিশুর বুদ্ধিমত্তার বিকাশের অপরিবর্তনীয় ক্ষতি হয়। এর অর্থ হলো যেসব শিশুর সিসার কারণে বুদ্ধি বিকাশ ব্যাহত হয়েছে, পরবর্তী সময়ে তাদের মধ্যে সিসার সংক্রমণ যদি কমিয়েও দেওয়া হয়, তাহলেও তাদের বুদ্ধির বিকাশের কোনো উন্নতি হবে না। সিসা পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হতে গেলে ধারাবাহিক নজরদারি দরকার। সিসা পরীক্ষার ক্ষেত্র বাড়ানো দরকার। সারা দেশে হয়তো ল্যাব তৈরি করা সম্ভব না, কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত পরীক্ষার সুযোগ থাকা দরকার। আর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং এর বাস্তবায়ন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।