প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে টোকিওতে থাকছেন না বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:৪৫ পিএম
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে টোকিওতে থাকছেন না বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত
জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী। ছবি: সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের সময় টোকিওতে থাকছেন না দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী। সফরের আগে তাঁকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রস্তুতি, দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ ও কূটনৈতিক সমন্বয়ের দায়িত্ব পালনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয় বিষয়াবলি) মো. নজরুল ইসলামকে টোকিও পাঠানো হয়েছে। তবে রাষ্ট্রদূতকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনার সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপান সফর করবেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গত ১৫ অক্টোবর চিঠি দিয়ে রাষ্ট্রদূত দাউদ আলীকে ঢাকায় ফিরতে বলা হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী, দুই দিনের মধ্যে তাঁকে দেশে উপস্থিত হতে বলা হয়েছিল। বর্তমানে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন।

সফরের প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক কার্যক্রম তদারক করতে মো. নজরুল ইসলামকে টোকিও পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ১৯ অক্টোবর। তিনি বুধবার (২১ অক্টোবর) জাপানে পৌঁছেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর টোকিওতে থাকার কথা রয়েছে। সফরের বিভিন্ন আয়োজন তদারকির পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ ও কূটনৈতিক সমন্বয়ের দায়িত্বও পালন করবেন তিনি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে আলোচনার জন্য দাউদ আলীকে ঢাকায় ডেকে পাঠানো হয়েছিল। তবে একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা হলেও সফরের প্রস্তুতিমূলক কাজে যুক্ত রাখা হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ সফরের আগে সংশ্লিষ্ট দেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতকে সরিয়ে রেখে মন্ত্রণালয়ের সচিবকে সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনা বিরল বলে জানিয়েছেন কূটনৈতিক সূত্রগুলো। সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কূটনীতিকের মতে, গত কয়েক দশকে এ ধরনের নজির তাঁদের জানা নেই। তবে রাষ্ট্রদূতকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ জানায়নি।

ঘোষিত সফরসূচি অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে এ সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ ও ব্যবসার সুযোগ বাড়ানো, জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদার নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ প্রশিক্ষণের বিষয়গুলোও আলোচনায় স্থান পেতে পারে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী।

সফরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়ে সমঝোতা স্মারক ও সহযোগিতা চুক্তির খসড়া বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে। সফরকালে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরামে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন। তাঁর খসড়া সফরসূচিতে জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ এবং জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনাও রয়েছে।

এ ছাড়া জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি), জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এবং সাকাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের প্রধানদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জাপানের বিভিন্ন জ্বালানি ও শিল্প স্থাপনা পরিদর্শন করতে পারেন। খসড়া সূচিতে এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, একটি পারমাণবিক কেন্দ্র এবং নাগোয়ায় টয়োটার উৎপাদন কারখানা পরিদর্শনের বিষয়টি রয়েছে।

বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো ও পরিবহন প্রকল্পে জাপান দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। মেট্রোরেল, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ির মতো প্রকল্পে দেশটির সহায়তা রয়েছে। এবারের সফরে চলমান প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া, নতুন বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক, উন্নয়ন ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরেও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধান, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনের প্রচেষ্টা নিয়ে দুই নেতার আলোচনার কথা রয়েছে।

এর আগে গত এপ্রিলে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে একটি অনলাইন বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন তারেক রহমান। ওই বৈঠকে এশিয়াজুড়ে জ্বালানি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাপানের নেতৃত্বাধীন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছিল বাংলাদেশ।

রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম দুজনই বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) ১৫তম ব্যাচের পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তা।

দাউদ আলী ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি রোমানিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। জাপানে দায়িত্ব নেওয়ার আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (কনস্যুলার ও কল্যাণ) হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।

দীর্ঘ কূটনৈতিক কর্মজীবনে দাউদ আলী টোকিও, প্রিটোরিয়া ও লন্ডনে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন। চীনের কুনমিংয়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেটে কনসাল জেনারেল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এ ছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরের বিভিন্ন অনুবিভাগে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। চলতি বছরের ৭ ডিসেম্বর তাঁর অবসর-উত্তর ছুটিতে (পিআরএল) যাওয়ার কথা রয়েছে।

অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে এবার টোকিওতে দ্বিপক্ষীয় সমন্বয় ও কূটনৈতিক যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করবেন সচিব মো. নজরুল ইসলাম। সফরের প্রস্তুতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠক ও আয়োজন তদারকিতে তাঁর ভূমিকা থাকবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে