বরিশালের উজিরপুরে পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহবায়ক নুরুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে দুই বছরের অধিক সময় ধরে একটি হিন্দু পরিবারের বাড়ি ও মন্দিরের সম্পত্তি জবর দখল করে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাড়ি ও মন্দিরের সম্পত্তি জবর দখল করে বাড়িসংলগ্ন মন্দিরের পাকা ফটকে 'খান বাড়ি' লিখে সাইনবোর্ড ঝুলানোর অভিযোগ রয়েছে ওই নেতার বিরুদ্ধে। ২১ অক্টোবর দুপুরে ভুক্তভোগী উজিরপুরের সার্বজনিন কেন্দ্রীয় কীর্তন আঙ্গিনা ও শ্রীগুরু মন্দিরের সভাপতি বরুণ মিত্র অভিযোগ করে বলেন, উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় সংসদ সদস্য, বিএনপি নেতাসহ থানা পুলিশের দ্বারস্থ হয়েও আমি কোন প্রতিকার পাইনি। আগে সাধারণ ডায়েরী করেও ফল না পাওয়ায় সম্প্রতি উজিরপুর মডেল থানায় আবার লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। ওই অভিযোগে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। উজিরপুর মডেল থানার ওসি রকিবুল ইসলাম অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি বরিশাল জেলা প্রশাসকের কাছে জেলা পুজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মানিক মুখার্জি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। হিন্দু পরিবারের বাড়ি ও মন্দিরের সম্পত্তি দখলমুক্ত করার দাবিতে এ অভিযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগে আরও জানা গেছে, ২০১৯ সালে বরুণ মিত্র উজিরপুর সার্বজনিন কেন্দ্রীয় কীর্তন আঙ্গিনা ও শ্রীগুরু মন্দিরসংলগ্ন চার শতক জমি ক্রয় করে সেখানে দ্বিতল ভবন নির্মাণ করেন। ভবনের একাংশ ভাড়া দিয়ে অপর অংশ মন্দিরের ব্যবহারের জন্য দান করেন। প্রতিবছর বার্ষিক কীর্তন উপলক্ষে মন্দির কর্তৃপক্ষ ভবনের ওই অংশ ব্যবহার করে আসছে। বরুণ মিত্র জানান, ২০২৪ সালের শুরুতে পারিবারিক ও ব্যবসায়িক কারণে তিনি বরিশাল নগরীতে বসবাস শুরু করেন। তার অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নুরুজ্জামান খান দলবল নিয়ে তার বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও মালামাল লুট করেন। পরে ভাড়াটিয়াদের মারধর করে বের করে দিয়ে বাড়িটি দখল করে নিয়েছেন। বরুণ মিত্র বলেন, আমি প্রায় ২০ বছর পর্যন্ত উজিরপুর সার্বজনীন কেন্দ্রীয় কীর্তন আঙ্গিনা ও শ্রীগুরু মন্দিরের সভাপতি। মন্দিরের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও আগত ভক্তদের সুবিধার্থে ভবনের একটি অংশ ব্যবহারের জন্য আমি আনুষ্ঠানিকভাবে বরাদ্দ করেছি। অভিযোগ করে তিনি বলেন, ঘটনার পর থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ। উপজেলা বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের জানিয়েও কোনো প্রতিকার মেলেনি। বরং অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে হুমকি অব্যাহত রাখা হয়েছে। বরুণ মিত্র আরো বলেন, জমির দলিল, বিএস পর্চা ও খাজনাসহ সব কাগজপত্র আমার নামে থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের ভূমিকা আমাকে চরম হতাশ করেছে। স্থানীয় বাসিন্দা কলেজ অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান বলেন, বিরোধপূর্ণ সম্পত্তির বৈধ ক্রেতা বরুণ মিত্র। একই খতিয়ানের ৮২ শতক জমি ১২টি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলে রয়েছে। ৫ আগস্টের অস্থিরতার সুযোগে নুরুজ্জামান খান বাড়িটি দখলে নিয়েছেন। মিজানুর রহমানের দাবি, জবরদখলের পরেও প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া উদ্বেগজনক। নুরুজ্জামান খানের কর্মকাণ্ডে স্থানীয় মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। উজিরপুর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রোকনুজ্জামান টুলু বলেন, বরুণ মিত্রের বাড়ি অন্যায়ভাবে দখল করা হয়েছে। দলের নাম ব্যবহার করে এমন কর্মকাণ্ডে বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। এতে কিছু নেতার উৎসাহ দুঃখজনক বলেও তিনি মন্তব্য করেন। রোকনুজ্জামান টুলু বলেন, বাড়ি ও মন্দিরের জমি দখলের বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্যকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। বাড়ি ও মন্দিরের সম্পত্তি দখলের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে নুরুজ্জামান খানের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিফ না করায় তার কোন ধরনের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। উজিরপুর মডেল থানার ওসি রকিবুল ইসলাম বলেন, আমার জানামতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাড়িটি দখল হয়েছে। জমি নিয়ে আদালতে মামলা থাকায় পুলিশের এখতিয়ার সীমিত। ওসি আরো বলেন, নতুন অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। তবে সেখানে অভিযোগকারীকে পাওয়া যায়নি। অপরদিকে দুই বছরের অধিক সময়েও বরুন মিত্রের বাড়ি ও মন্দিরের সম্পত্তি দখলমুক্ত না হওয়ায় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়সহ এলাকার সুশিল সমাজের নেতৃবৃন্দের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা অবিলম্বে ওই বাড়ি ও মন্দিরের সম্পত্তি দখলমুক্ত করতে প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।