আমার স্বামীকে যারা মারছে ওদের শাস্তি হোক। আমার স্বামীকে যেমনে মারছে ওদেরকে গুলি করে মারা হোক। আমার স্বামী যতটুকু কষ্ট পাইছে ওদেরকেও অতটুকু কষ্ট দেওয়া হোক। একটা রাত আমারে একা রাখে নাই এখন আমি এতদিন কিভাবে থাকব? কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন নেত্রকোনার দুর্গাপুরে দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফ’র স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) উপজেলার বিরিশিরির তেলুঞ্জিয়া গ্রামে তার শ্বশুরবাড়িতে গেলে দুই সন্তানকে কোলে নিয়ে আহাজারি করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন তিনি। এর আগে গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সাড়ে ৭টার দিকে দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহতের ঘটনা ঘটে। স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বলেন, আমি এতদূর পড়াশোনা করতে পারছি এই দুইটা বাচ্চা নিয়ে আছি একমাত্র তার (স্বামী)র জন্য। আমি নিজের হাতে কইবার ভাত খাইছি এটা গুনে বলতে পারব। কারণ এই পাচ বছরে আমি উনার হাতেই ভাত খাইছি।
তিনি আরও বলেন, আমি ঘরে ছিলাম সে দোকানে যাইতেছে এইটুকু দেখছি আমি একটু পরে গুলির শব্দ শুনছি ওখান থেকে তারপর এইজন ছুটে গিয়ে বলতেছে যে তোমার স্বামীকে কেউ গুলি করছে তখনই আমি বাচ্চাদেরকে রাইখা আমি গিয়ে দেখি। আমি চাই আমার স্বামী হত্যাকারীদের বিচার হোক শাস্তি হোক। আমরা যেন দেখতে পারি।
জানা গেছে, সাংবাদিক স্বামীর মৃত্যুতে দুই সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন স্ত্রী। এই সাংবাদিকের শরীরে ছয়টি গুলি করা হয়েছে দাবি পরিবারের। নিহত আলিফ ফকির (বেসরকারী আইপি টিভি) রূপসী বাংলার নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি ছিলেন। হত্যাকান্ডের পেছনে ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামের একটি ফেসবুক পেজকে ঘিরে আলোচনা উঠেছে। দুর্গাপুর-কলমাকান্দা সীমান্ত দিয়ে চোরাচালানের তথ্য ও ভিডিও সংগ্রহ করে প্রচার করতেন তিনি। এ ঘটনার পর থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামের ফেসবুক পেইজটি। ডিটেকটিভ আর্টিকেল ফেসবুক পেইজ ঘুরে দেখা যায়, গত বুধবার ‘আগামীকাল চাঞ্চল্যকর অপরাধের গডফাদারের তথ্য-প্রমাণ’ একটি লেখাও প্রচার করা হয়। এই ফেসবুক পোস্টকে ঘিরেই এখন যত গুঞ্জন। ফেসবুক ব্যবহারকারীরা লিখাটাকে নিজেদের ফেসবুকে পোস্ট করছে ও প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে সীমান্তে মাদক ও বিভিন্ন পণ্য চোরাচালানের ছোট ছোট ভিডিও ও লেখা প্রচার করা হয়েছে পাশাপাশি নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্যও প্রচার করা হয়েছে পেইজটিতে।
প্রত্যক্ষদর্শী দোকানমালিক রবিন রাংসা জানান, সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান সিগারেট নিতে দোকানে এসে ভুলবশত তার মোবাইল ফোন রেখে চলে যান। পরে আবার মোবাইল নিতে এসে দোকান থেকে যাওয়ার সময়ই গুলি ছোড়েন দুই দুর্বৃত্ত। গুলির শব্দ শুনে ভয়ে দোকানের ভেতরে চলে যান তিনি। তবে হামলাকারীদের চিনতে পারেননি তিনি। এ বিষয়ে দুর্গাপুর থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ জানান, ঘটনাস্থল থেকে একটি তাজা গুলি সহ বেশকিছু আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। তাছাড়া সিআইডি, পিবিআইসহ এসআরবির প্রত্যেক টিম এসেছেন,আমাদের এসপি স্যার এসেছেন। আমাদের সিনিয়র স্যাররা কাজ করতেছেন। এই হত্যাকান্ডের মোটিভ কী ছিল এটা আমরা বের করার চেষ্টা করতেছি। তিনি আরও বলেন, কারা ঘটনার সাথে জড়িত সনাক্ত করতে কাজ করছি। সনাক্তের পর গ্রেফতার করার জন্য আমরা মুভ করব। আমাদের একজন দক্ষ অফিসারকে তদন্তভার দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য যে,এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসের ১০ তারিখ দুর্গাপুরস্থ তেরীবাজার ফেরীঘাট নামক স্থানে এই সাংবাদিক দুবৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মারাত্নক ভাবে আহত হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিচ্ছিল। এ বিষয়ে সে বাদী হয়ে বেশ কয়েকজনকে বিবাদী করে মামলাও করেছিল,মামলাটি চলমান রয়েছে বলে জানাগেছে। তার সজনরা জানান ময়না তদন্ত শেষে তার গ্রামের বাড়ী কলমাকান্দা উপজেলার চারুলিয়া মাইজপাড়ায় শুক্রবার বাদ আসর জানাজা শেষে লাশ দাফন করা হয়। সে আদিবাসী স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা ,আয়ান ফকির ও মুন্তাহা জামান প্রান্তি নামের দুটি সন্তান রেখে গেছেন। তার পরিবারের সদস্য সহ আশপাশের লোকদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।