শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার নয়াবিল ইউনিয়নের চাটকিয়া গ্রামের বাসিন্দা সেন্টু হাজং। কৃষক পরিবার থেকে বেড়ে উঠা সেন্টু এসএসসি পাস করার পর অর্থের অভাবে আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। তবে তার শিক্ষাজীবন থেমে গেলেও থামেনি নতুন কিছু করার আগ্রহ।
নেই কোনো গবেষণাগার। নেই আধুনিক যন্ত্রপাতি কিংবা বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি জরাজীর্ণ ঘরে থেকে নিজের ১২ কাঠা আবাদি জমিকে গবেষণাগার বানিয়ে ধানের নতুন জাত উদ্ভাবন করে যাচ্ছেন কৃষক সেন্টু চন্দ্র হাজং (৫৫)। দীর্ঘ ২১ বছরের প্রচেষ্টায় এখন পর্যন্ত তিনি ২৫ জাতের নতুন ধান উদ্ভাবন করেছেন। এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছেন নতুন ধান উদ্ভাবনের। আর প্রক্রিয়াধীন রয়েছে আরও দুই শতাধিক। তার উদ্ভাবিত ধান চাষ করে লাভবান হচ্ছেন স্থানীয় শত শত কৃষক। ফলে বাজারেও বাড়ছে এসব ধানের চাহিদা। স্থানীয় কৃষি বিভাগও সেন্টু হাজংয়ের দীর্ঘদিনের এই গবেষণার বিষয়ে অবগত। তবুও এখনো মেলেনি কোনো জাতীয় স্বীকৃতি।
জানা গেছে, ২০০৫ সালে স্থানীয় একটি এনজিওর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নেন সেন্টু হাজং। এরপর ধানের জাত নিয়ে পরীক্ষামূলক কাজ শুরু করেন। ধানের জাত উদ্ভাবনে তিনি ব্যবহার করেন ব্রিডিং বা সংকরায়ণ পদ্ধতি। একটি নতুন জাত তৈরি করে সেটি যাচাই করতে তার সময় লেগেছে সাত বছর। নিজের ১২ কাঠা জমিতে বর্তমানে ৪৪০টি পরীক্ষামূলক প্লট তৈরি করেছেন। বছরের বিভিন্ন সময়ে নানা জাতের ধান নিয়ে তিনি পরীক্ষা চালান। একটি ব্যর্থ হলেও হাল ছাড়েন না। আবারও শুরু করেন নতুন গবেষণা। যার কারণে ইতোমধ্যে তিনি সফল হয়েছেন। সফলতার পর থেকেই তার নামেই বাজারে চলছে এসব ধান। তার প্রথম সফল উদ্ভাবন ‘সেন্টু শাইল’। দীর্ঘ সাত বছরের চেষ্টার পর এই জাতটি উদ্ভাবন করেন সেন্টু।
বর্তমানে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে এ ধানের ভালো চাহিদা রয়েছে। এরপর থেকে একে একে আরও নতুন জাত উদ্ভাবনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সেন্টু। যা সেন্টু-১ থেকে সেন্টু-২৫ নামেই রয়েছে। তবে এরমধ্যে উদ্ভাবিত সেন্টু শাইল, তিন ধরণের সেন্টু পাইজাম, তিন ধরণের চিনি শাইল ও তুলশিমালা অন্যতম। স্থানীয় কৃষি বিভাগ সেন্টু হাজংয়ের দীর্ঘদিনের এই গবেষণার বিষয়ে অবগত। এতদিনেও তার কাছে কোনো সরকারি প্রণোদনা বা বিশেষ সহায়তা পৌঁছায়নি। শুধু তাই নয়, এখনো মেলেনি কোনো স্বীকৃতি।
সেন্টু শুধু নতুন জাত উদ্ভাবন নয় হারিয়ে যেতে বসা দেশি ধানের জাত সংরক্ষণেও কাজ করছেন। তিনি এরই মধ্যে বগি, হালই, গোলাপী, মালঞ্চি, ময়নাগিড়ি, মালসিরা, অনামিয়া, পারিজাত, আপচি, কাইশাবিন্নি, মারাক্কাবিন্নি, শংবিন্নি, দুধবিন্নি, বিরই, চাপাল ও খাসিয়াবিন্নিসহ বিভিন্ন দেশি জাত প্রতিবছর নিজের জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করছেন। সেন্টু হাজংয়ের ১২ কাঠা জমিজুড়ে চলছে এসব গবেষণা। বর্তমানে ঢেপা, চাপাল, পুরাবিন্নি ও নেদরাবিন্নিসহ বিভিন্ন জাত নিয়ে পরীক্ষা করছেন। এসব চাষে তিনি গোবর ও নিজস্বভাবে তৈরি কেঁচো কম্পোস্ট সার ব্যবহার করেন।
কৃষক সেন্টু হাজং বলেন, দেশি ধানের অনেক জাতই এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে। অথচ এসব ধানের আলাদা স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য আছে। অনেক জাতের পোকার আক্রমণও তুলনামূলক কম। তাই দেশি ধানের জাতগুলো আমি সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি নতুন জাত উদ্ভাবনের চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমি এখনো কোনো সরকারি স্বীকৃতি পায়নি। এছাড়া আমার কোনো ল্যাবও নেই। আমি আমার ভাঙা ঘরে থেকেই এসব ধান উদ্ভাবিত করে যাচ্ছি। সরকারিভাবে যদি আমাকে একটি ল্যাব বানিয়ে দেয়, তাহলে অনেক কিছু সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে আমার। আমি যেনো আরও নতুন জাত এবং হারিয়ে যাওয়া দেশি ধান সংরক্ষণ করতে পারি সেজন্য আমি কাজ করে যাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, জৈবসার ব্যবহারের কারণে উৎপাদন খরচ কমেছে। গোবর ও কেঁচো কম্পোস্ট ব্যবহারে গাছ শক্ত ও মজবুত হয়। ঝড়-বৃষ্টিতেও সহজে হেলে পড়ে না। জমিতে পোকার আক্রমণ দেখা দিলে নিমপাতা, গোলঞ্চপাতা ও বাসকপাতা পানিতে ফুটিয়ে তা জমিতে স্প্রে করেন তিনি। এসব নিয়ম মেনে ভালোভাবে চাষ করতে পারলে দেশি জাতের ধান থেকে একরে ৪০ থেকে ৫০ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব। এদিকে তার উদ্ভাবিত ধানের প্রতি স্থানীয় কৃষকদের আগ্রহও বাড়ছে। সেন্টুর উদ্ভাবিত ২৫টি জাতের মধ্যে বেশকিছু ধান বাজারজাত করা হচ্ছে।
নালিতাবাড়ীর চাটকিয়া গ্রামের কৃষক ডালিম মিয়া বলেন, আমন মৌসুমে আমি ২ একর জমিতে সেন্টু শাইল আবাদ করেছি। এর আগেও তার ধান আবাদ করেছি। আগে অন্যান্য ধানে যা উৎপাদন হয়েছে, বর্তমানে সেন্টুর ধান আবাদ করার ফলে আবাদ অনেক বেড়ে গেছে। শুধু আমি না, এই এলাকার প্রায় সব কৃষকই এখন সেন্টুর ধান আবাদ করে। একই এলাকার আরেক কৃষক রাজ্জাক মিয়া বলেন, সেন্টুর কয়েকটা জাতের ধান আবাদ বেশি হয় এই অঞ্চলে। কারণ, তার ধান উৎপাদন খুব বেশি। আমরা তার ধানই আবাদ করি এখন। অন্য কোনো ধান আবাদ করি না। আমন মৌসুমে তার ধান ছাড়া আবাদ করার কোন কথায় ভাবিই না।
নালিতাবাড়ীর বীজ বিক্রেতা আল-আমিন বলেন, আমন মৌসুমে সেন্টুর চারটি জাতের ধান চাহিদা খুব বেশি থাকে। সিজন শুরুর আগে থেকেই আমরা এসব ধান সংগ্রহ করি। তারপরও অনেক দোকানে দেখা যায়, ধান পাওয়া যায় না।
একই এলাকার বীজ বিক্রেতা আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, সেন্টুর বীজের চাহিদা খুব বেশি। এ এলাকার বেশিরভাগ মানুষই সেন্টুর ধান আবাদ করে। যেহেতু আবাদ বেশি হয়, তাই তারা এইগুলো ধান আবাদ করে। আমরাও এসব বীজ সংগ্রহ করি আগে থেকেই।
ধান ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিন বলেন, বাজারে সেন্টু-পাইজাম ধানের সরবরাহ ও চাহিদা দুটোই রয়েছে। সেন্টু আতপ ধানেরও চাহিদা ভালো। মৌসুমে প্রতি মণ আতপ ধান ১৭শ থেকে ২ হাজার টাকা দরে কিনতে হয়। সেন্টুর ধান দেখতেও সুন্দর, চালও দারুণ হয়। সেন্টুর ধান পেলেই আমরা সেটা আগে কিনি।
শেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সেন্টু হাজং তিনি নিজ উদ্যোগে দেশি ধানের জাত উদ্ভাবন করে এলাকায় কৃষিতে নতুন আগ্রহ তৈরি করেছেন। স্থানীয় কৃষিতে অবদানের জন্য তাকে উদ্ভাবক হিসেবে স্বীকৃতি ও পুরস্কারের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ে নাম পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। আশা করছি, সব প্রস্তুতি শেষে দ্রুতই স্বীকৃতি মিলবে। এছাড়া আমরা কৃষি বিভাগ থেকে তাকে সহযোগিতা ও পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। উপজেলার বিভিন্ন প্রোগ্রামে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।