কৃষিকে লাভজনক করতে প্রণোদনা ও ভর্তুকি দিতে হবে: রাষ্ট্রপতি

নিজস্ব প্রতিবেদন | প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:২২ পিএম
কৃষিকে লাভজনক করতে প্রণোদনা ও ভর্তুকি দিতে হবে: রাষ্ট্রপতি
ছবি : সংগৃহীত

কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, কৃষিতে সরকারি প্রণোদনা ও ভর্তুকি বাড়ানো এবং গবেষণায় বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন ও পণ্যের মান উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, কৃষিকাজ করে পর্যাপ্ত আয় না হওয়ায় শ্রমিকেরা এ পেশা ছেড়ে যাচ্ছেন। ফলে মাঠে কাজের লোক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। কৃষিকে লাভজনক খাতে পরিণত করতে কৃষকদের সহায়তার পাশাপাশি আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কৃষিবিজ্ঞানীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) গাজীপুরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) পরিদর্শনকালে এক মতবিনিময় সভায় রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। কৃষিপণ্যের উৎপাদন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং কৃষিবিজ্ঞানীদের পেনশন সুবিধাসহ কৃষি খাতের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।

রাষ্ট্রপতি বলেন, কৃষি এখন অনেক ক্ষেত্রেই লাভজনক পেশা নয়। উৎপাদন খরচ বাড়লেও কৃষকেরা ফসল বিক্রি করে ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, ফসল উৎপাদনের সময় তাঁদের বেশি দামে বীজ কিনতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচও ওঠে না। এ কারণে কৃষকেরা ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।

কৃষিকে লাভজনক করতে সরকারকে প্রণোদনা দিতে হবে এবং কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। প্রয়োজনে ভর্তুকি দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন রাষ্ট্রপতি। তাঁর ভাষ্য, আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ভর্তুকি দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দিলেও কৃষকদের স্বার্থ ও দেশের খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশে কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়লেও যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ সমস্যা সমাধানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে।

উত্তরাঞ্চলে প্রচুর আলু উৎপাদিত হলেও কৃষকেরা অনেক সময় ন্যায্যমূল্য পান না। বিক্রি করতে না পেরে তাঁদের আলু রাস্তায় ফেলে দিতে হয়। অথচ পরবর্তী সময়ে বীজ আলুর দাম বেড়ে যায়। উৎপাদনস্থল থেকে ঢাকায় পৌঁছানোর পরও আলুর দাম অনেক বেড়ে যায়। অন্যান্য সবজির ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আলু, টমেটোসহ বিভিন্ন সবজি ও ফলমূল দীর্ঘদিন ভালো রাখার উপযোগী কোল্ড স্টোরেজ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বানও জানান তিনি।

পেঁয়াজ উৎপাদনে দেশের গবেষকদের সাফল্যের প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, একসময় পেঁয়াজ আমদানিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হতো। বর্তমানে দেশে উৎপাদন বাড়ায় আমদানির প্রয়োজন না হওয়া ইতিবাচক অগ্রগতি। ফল উৎপাদনেও বাংলাদেশ এগিয়েছে। তবে ফলের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের দিকে আরও নজর দিতে হবে।

রাষ্ট্রপতি কৃষি গবেষণায় সরকারি বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, গবেষণায় বিনিয়োগের সুফল সরাসরি কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তায় পাওয়া যায়। তাই জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে নতুন জাত উদ্ভাবন, প্রযুক্তির উন্নয়ন ও গবেষণা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।

বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদনে কৃষিবিজ্ঞানীদের অবদানের কথাও তুলে ধরেন তিনি। স্বাধীনতার পর দেশে জনসংখ্যার তুলনায় খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতি ছিল। বর্তমানে বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে উদ্বৃত্ত অবস্থায় পৌঁছেছে। উচ্চফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবনে গবেষকদের অবদান এ অগ্রগতির অন্যতম কারণ।

কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার বিষয়টি উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ধান রোপণ, ধান কাটা ও আগাছা দমনে বিভিন্ন যন্ত্রের ব্যবহার কৃষিকাজে পরিবর্তন এনেছে। এ অগ্রগতি ধরে রাখতে গবেষণা ও প্রযুক্তির উন্নয়নে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) পরিদর্শনকালে ‘খাদ্যনিরাপত্তায় ব্রির অবদান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভাতেও কৃষি গবেষণা, ধানের ন্যায্যমূল্য এবং গবেষকদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে রাষ্ট্রপতি ধান উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।

কৃষিজমিতে অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, অতিরিক্ত সার মাটির ক্ষতি করছে এবং ফসলের গুণগত মান নষ্ট করছে। এ বিষয়ে কৃষকদের সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি টেকসই কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

কীটনাশকের মান উন্নয়ন এবং পরিবেশের ক্ষতি কমাতে গবেষণার ওপরও গুরুত্ব দেন মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়া বক্তারা। তাঁদের মতে, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই চলবে না, কৃষিপণ্যের গুণগত মানও নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎপাদন বেড়েছে উল্লেখ করে বক্তারা রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষিপণ্য পৌঁছে দিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে বলেও তাঁরা মত দেন।

কৃষিবিজ্ঞানীদের কাজের পরিবেশ, বেতনকাঠামো ও অবসরকালীন সুবিধা উন্নত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, কৃষিবিজ্ঞানীরা গবেষণার মাধ্যমে দেশের কৃষি ও সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। অথচ চাকরি শেষে তাঁদের পেনশন না পাওয়ার বিষয়টি অমানবিক।

প্রয়োজনে আইন ও বিধিমালা পরিবর্তন করে কৃষিবিজ্ঞানীদের পেনশন সুবিধা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। এ বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, গবেষকদের যথাযথ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া না হলে মেধাবী শিক্ষার্থীদের এ পেশায় আকৃষ্ট করা কঠিন হবে।

গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের যথাযথ মূল্যায়ন এবং তাঁদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করাকে সরকারের দায়িত্ব বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কৃষি উন্নয়নে অবদানের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, খাল খনন কর্মসূচি ও উচ্চফলনশীল ধানের বীজ সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন উদ্যোগ দেশের কৃষি খাতে পরিবর্তন এনেছিল।

এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা, কৃষিবিদ ও কৃষিবিজ্ঞানীদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান এবং আহত ব্যক্তিদের সুস্থতা কামনা করেন।

অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল করিম রনি, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান, বারির মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল কাদির এবং ব্রির মহাপরিচালক ড. মো. রফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার, ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

এর আগে বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে বারি প্রাঙ্গণে পৌঁছালে রাষ্ট্রপতিকে বাংলাদেশ পুলিশের একটি সুসজ্জিত দল গার্ড অব অনার দেয়। পরে তিনি বারির ইনোভেশন স্টল, জিন ব্যাংক, বিভিন্ন কৃষিপ্রযুক্তি ও গবেষণা মাঠ পরিদর্শন করেন। সবশেষে উদ্ভিদ কৌলিসম্পদ কেন্দ্রের (পিজিআরসি) প্রাঙ্গণে বারি কাঁঠাল-৬ জাতের একটি চারা রোপণ করেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে