লক্ষ্ণীপুরের রায়পুর উপজেলার উত্তর চরবংশী ইউনিয়নের মেঘনা বাজার এলাকার ‘শারমিন এগ্রো অ্যান্ড ফিশারি’-তে রাতের আঁধারে মাছের ঘেরে ঢ়ুকে এক কেয়ারটেকারকে হাত-পা বেঁধে বেধড়ক মারধর ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। শুধু তা-ই নয়, আর্তচিৎকার যেন বাইরে না আসে, সেজন্য মুখে কাপড় গুঁজে তাঁকে ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা। ঘটনাটি ঘটেছে আহত ব্যক্তির নাম সবুজ শেখ (৩৮)। তিনি উক্ত ফিশারির কেয়ারটেকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে প্রতিদিনের মতো জেলেরা ফিশারিতে মাছ ধরতে গেলে সবুজ শেখকে হাত-পা বাঁধা ও মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। তাঁদের চিৎকারে স্থানীয়রা ছুটে আসেন এবং তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে প্রথমে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চাঁদপুর সদর হাসপাতালে পাঠান। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আহত সবুজ শেখের স্ত্রী শারমীন আক্তার বলেন, আমার স্বামী মাছের ঘেরে পাহারার কাজ করতেন। তাঁকে এভাবে হাত-পা বেঁধে মারধর করা হয়েছে। তিনি এখন হাসপাতালে, ঠিকমতো কথা বলতেও পারছেন না। আমরা তাঁর চিকিৎসা ও সুস্থতা নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি। যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের শনাক্ত করে বিচার চাই।
স্থানীয় বাসিন্দা ও গৃহিণী নাজমা বেগম বলেন, এখানে স্থানীয় এলাকায় রাতের বেলা কিশোর গ্যাংয়ের আনাগোনা, অসামাজিক কর্মকাণ্ড এবং নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে তাদের ভয় লাগছে। পর্যটনের নামে নদীর পাড়ে এসে নানা প্রকার অসামাজিক কাজে কিশোর প্রকাশে অপরাধে করছেন। এদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। শারমীন এগ্রো ফিশারি সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনা পরিচালক হানিফ জানান, গুরুতর জখম হওয়ায় সবুজ শেখ এখনো কথা বলার মতো অবস্থায় নেই; তিনি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। হামলাকারীদের শনাক্ত ও তাদের বিচার কামনা করেছেন ।
তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ৫/৬ জনের বিরুদ্ধে রায়পুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে উল্লেখ করেন, আহত সবুজকে খামার মালিক হানিফ হাসপাতালে ব্যস্ত থাকায় এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করতে গিয়ে লিখিত অভিযোগ দিতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তবে ঘটনার দুই দিন পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা নথিভুক্ত হয়নি বলে জানা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঘটনার পর শুক্রবার পর্যন্ত পুলিশের কোনো টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে আসেনি, যা তাঁদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
এলাকাবাসী ও ফিশারি কর্তৃপক্ষ অনতিবিলম্বে এই নৃশংস হামলার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িত দুর্বৃত্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। অভিযোগে বলা হয়, ঘটনার রাতে দুইটা থেকে তিনটার মধ্যে কয়েকজন ব্যক্তি মাছের খামারে ঢ়ুকে পাহারাদার সবুজ শেখকে মারধর করেন। একপর্যায়ে তাঁর হাত-পা পেছনে বেঁধে মুখে কাপড় গুঁজে রাখা হয়। পরে তাঁকে ফেলে রেখে চলে যায় হামলাকারীরা। ভোরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা তাঁকে দেখতে পেয়ে চিৎকার শুরু করেন। তাঁদের চিৎকার শুনে খামারের অংশীদার হানিফ মিয়াসহ অন্যরা তাঁকে উদ্ধার করেন।
প্রথমে সবুজকে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে চাঁদপুর সদর হাসপাতালে পাঠান। সেখানে তাঁর চিকিৎসা চলছে। আহত সবুজের বর্তমান শারীরিক অবস্থা নিয়ে পরিবারের সদস্যরা উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। সবুজের বাড়ি জালিয়ার চরে। স্ত্রী শারমিন ও সন্তানদের নিয়ে তাঁর সংসার। পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁর মেয়ে খাদিজার বয়স ১৫ বছর, সানজিদার ১৪ বছর এবং ছেলে তাফসিরুলের বয়স ছয় বছর। পরিবারের উপার্জন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে তাঁদের মধ্যে। একদিকে হাসপাতালে স্বামীর সুস্থতার অপেক্ষা, অন্যদিকে হামলার ঘটনায় ন্যায়বিচারের আশায় দিন কাটছে পরিবারের।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের আনাগোনা ও বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। তাঁদের দাবি, রাতের আঁধারে একদল কিশোর মাছের ঘেরে এসে এ হামলা চালিয়েছে। তবে হামলাকারীরা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য কি না, তা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনার পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা-ও স্পষ্ট নয়।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ঘটনার পর শুক্রবার পর্যন্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়নি। দুই দিন পেরিয়ে গেলেও মামলা না হওয়ায় তাঁরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপ কী, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
খামারের অংশীদার হানিফ মিয়া অভিযোগে উল্লেখ করেন, আহত সবুজের চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় থানায় অভিযোগ করতে কিছুটা দেরি হয়েছে। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের পরামর্শে তিনি আইনের আশ্রয় নেন। রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, “এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” এলাকাবাসীর দাবি, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে হামলাকারীদের শনাক্ত করতে হবে। পাশাপাশি এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।