হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের দান-খয়রাত ও মানতের অর্থ ভাগ-ভাটোয়ারা না করে জেলা প্রশাসনের নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে জমা, মাজার পরিচালনা কমিটি সংস্কার এবং মাজারের সার্বিক ব্যবস্থাপনা জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে নেওয়ার দাবিতে স্মারকলিপি দিয়েছে ‘একতাবদ্ধ সিলেটবাসী’।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় সিলেটের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী, প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক বরাবর এ স্মারকলিপি দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসকের পক্ষে স্মারকলিপি গ্রহণ করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) সাঈদা পারভীন।
বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ রেজাউল করিম জালালীর নেতৃত্বে স্মারকলিপি প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন সিলেট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মইনুল ইসলাম আশরাফী, মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বকুল, এম এ আলী জালালাবাদী, মো. জয়নাল আবেদীন, মুজিবুর রহমান, মুখতার আহমদ তালুকদার, মোহাম্মদ এহছানুল হক তাহের, রফিকুল ইসলাম সিতাব, তোফায়েল আহমদ, আনোয়ার আহমদ, সৈয়দ ফেরদৌস আহমদ, মো. মখলিছ মিয়া, সৈয়দ রাসেল, ইমতিয়াজ রহমান ইনু, টিপু চৌধুরী, রুবেল আহমদ তালুকদার, আব্দুল শহীদ খান, মো. কামাল মিয়া, মো. সাহেদ আহমদ শান্ত, মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, শামসুল হক, মোহাম্মদ ইমরান হোসেন, মাওলানা শিব্বির আহমদ, মাওলানা সানুল আহমদ, মাওলানা এম. এ রহিম, হাবিবুর রহমান হাবিবসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও সচেতন নাগরিকরা। আয়োজকদের দাবি, এতে প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি অংশ নেন।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, গত ১২ জুন সাবেক জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার পরিদর্শন করেন। ওই সময় তিনি মাজারের আয়-ব্যয়ের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান। এর অংশ হিসেবে ১৮ জুন শাহজালাল (রহ.) মাজারে নতুন চারটি দানবাক্স স্থাপন করা হয়। একই সময়ে মাজারে দানের অর্থ রাখার জন্য থাকা ঐতিহাসিক তিনটি দানের ডেগ ও একটি দানবাক্স সিলগালা করা হয়। স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে এ পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে একবারসহ মোট চারবার প্রকাশ্যে মাজারের দানের টাকা গণনা করে নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়া হয়েছে। সাবেক জেলা প্রশাসক মাজার-সংক্রান্ত বিষয় জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালিত হবে বলে ঘোষণা করেছিলেন উল্লেখ করে ‘একতাবদ্ধ সিলেটবাসী’ দাবি করে, মাজারের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও হিসাব-নিকাশ জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রাখা হোক।
সংগঠনটির দাবি, গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে মাজারে দানকৃত অর্থের ৬৫ শতাংশ খাদেমদের এবং ৩৫ শতাংশ উন্নয়ন খাতে ব্যয় করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এ ঘোষণায় সিলেটবাসীর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়। তাদের প্রত্যাশা ছিল, মাজারের দানসহ সার্বিক বিষয় জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, দেশ-বিদেশের ধর্মপ্রাণ ভক্ত ও অনুরাগীরা প্রতিদিন হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতে এসে নগদ অর্থসহ বিভিন্ন সামগ্রী দান করেন। মাজারের দীর্ঘ ইতিহাসে দানের অর্থ প্রকাশ্যে গণনার ব্যবস্থা ছিল না দাবি করে সংগঠনটি জানায়, সাবেক জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের উদ্যোগে প্রকাশ্যে অর্থ গণনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখারও দাবি জানানো হয়। মাজার পরিচালনায় ‘একতাবদ্ধ সিলেটবাসী’ প্রস্তাব করেছে, মাজারের সম্পূর্ণ জমি জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে এনে একটি দৃষ্টিনন্দন মাজার কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হোক। মাজারের দান-খয়রাত ও মানতের সম্পূর্ণ অর্থ কোনো ধরনের ভাগ-ভাটোয়ারা না করে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে জমা এবং মাজার-সংক্রান্ত যাবতীয় খরচ জেলা প্রশাসন কর্তৃক নিয়োগকৃত নির্দিষ্ট ব্যক্তির মাধ্যমে রশিদের বিপরীতে গ্রহণের ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিদিনের পরিবর্তে সপ্তাহে একদিন প্রকাশ্যে মাজারের দানের অর্থসহ হিসাব গণনা, প্রতি তিন মাস অন্তর আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ এবং প্রতিবছর অডিটের মাধ্যমে পূর্ণ হিসাব-নিকাশ পর্যালোচনা করে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তা প্রকাশের প্রস্তাব করা হয়েছে।
মাজারের মুসাফিরখানা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালনা, মানতের গরু, খাসি ও মোরগ দিয়ে দুই বেলা শিরণি বিতরণের ব্যবস্থা, মাজারে দান করা কোরআন শরিফ, নগদ অর্থ, স্বর্ণ, রৌপ্য, বিদেশি মুদ্রা, গবাদিপশু, হাঁস-মোরগ, মোমবাতি, আগরবাতি, গোলাপজল, গিলাফসহ অন্যান্য সামগ্রী রশিদের মাধ্যমে জেলা প্রশাসনের নিয়োগকৃত নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থারও দাবি জানানো হয়েছে। মাজারের ডেগসহ দানের প্রতিটি স্থানকে হিসাবের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে সংগঠনটি সিঁড়ির ওপরের অংশ, কবরের ওপর ও পাশে দেওয়া অর্থ, ঝর্ণার পাশে এবং পুকুরের পশ্চিম পাশে মাছের দোকানসহ মাজারকেন্দ্রিক বিভিন্ন স্থানে আসা দানের অর্থ হিসাবের আওতায় আনার প্রস্তাব করেছে। একই সঙ্গে গণশৌচাগার, জুতা রাখার স্থান, গোসলখানা ও বিশ্রামঘর জেলা প্রশাসনের নিয়োগকৃত ব্যক্তিদের মাধ্যমে পরিচালনা, হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর নামে মাজারের ভেতরে গ্রন্থাগার ও গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন এবং তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্র ও স্মৃতিসামগ্রী প্রদর্শনের জন্য একটি কক্ষ স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। মাজার পরিচালনায় কর্মচারী নিয়োগসহ সার্বিক কার্যক্রম জেলা প্রশাসনের তদারকিতে রাখারও দাবি জানানো হয়। স্মারকলিপিতে উল্লেখিত প্রস্তাবগুলো আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়েছে।