ভেজাল ও নকল সার-কীটনাশকে ক্ষতির মুখে পড়ছে কৃষক

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:৩৪ এএম
ভেজাল ও নকল সার-কীটনাশকে ক্ষতির মুখে পড়ছে কৃষক

ভেজাল ও নকল সার-কীটনাশকে ক্ষতির মুখে পড়ছে দেশের কৃষক। দেশের বিভিন্ন এলাকায় সারের সংকট ও বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে ভেজাল ও নকল সার তৈরির কারখানা গড়ে উঠছে। পাশাপাশি অনুমোদনহীন ও ভেজাল কীটনাশক তৈরি করে নামিদামি কোম্পানির মোড়কে করা হচ্ছে বাজারজাত। কোথাও ইটের গুঁড়ো, চুন, বালি, সিমেন্ট ও বিভিন্ন রাসায়নিক মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে সার, কোথাও আবার মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিষিদ্ধ কীটনাশকের মোড়ক বদলে বিক্রি করা হচ্ছে। প্রশাসনের অভিযানে এমন একাধিক ঘটনা ধরা পড়ছে। কৃষিতে ভেজাল পণ্য ব্যবহারে কাঙ্ক্ষিত ফলন না পাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন খরচও বাড়াচ্ছে। চমকপ্রদ মোড়কে বাজারে ওই ধরনের সার বিক্রি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রশাসন দেশের বিভিন্ন এলাকায় সামপ্রতিক সময়ে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ভেজাল সার ও কীটনাশক, উৎপাদনের কাঁচামাল ও সরঞ্জাম জব্দ করেছে। ওসব ঘটনায় নেয়া হয়েছে জরিমানা, কারাদণ্ড, পণ্য ধ্বংস ও কারখানা সিলগালার মতো ব্যবস্থাও। তার মধ্যে মানিকগঞ্জে বাজার থেকে সংগৃহীত সার ও কীটনাশকের নমুনা পরীক্ষা করে ৭টি কোম্পানির সারে ভেজাল পাওয়ার তথ্য মিলেছে। অসাধু চক্র অবৈধভাবে ডলোমাইট চুন, সিরামিক মাটি, সিমেন্ট ও হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডসহ বিভিন্ন উপাদান দিয়ে ভেজাল ও নকল সার তৈরি করে দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষক ও মৎস্য খামারিদের কাছে বিক্রি করতো।

সূত্র জানায়, ভেজাল সার ও কীটনাশকে কৃষকরা পড়ছে চরম ক্ষতির মুখে। একদিকে কৃষক দাম দিয়ে কিনছে ভেজাল ও নকল পণ্য। অন্যদিকে ওসব পণ্যে কাঙ্ক্ষিত ফলন পাচ্ছে না। ফলে কৃষককে আবারো সার বা কীটনাশক কিনতে বাধ্য হওয়ায় বেড়ে যাচ্ছে উৎপাদন খরচ। তাছাড়া নিম্নমানের বা ভুল উপাদানের কীটনাশক ব্যবহারে পোকামাকড় দমন না হওয়ায় তৈরি হচ্ছে ফসল নষ্টের ঝুঁকিও। সার ও কীটনাশক কৃষির অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। ওগুলোর প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে ফসলের উৎপাদনশীলতা অনেকাংশ। ওসব উপকরণের মান খারাপ হলে কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়া স্বাভাবিক। ভেজালের বিস্তার বাড়লে কৃষকের পাশাপাশি সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনশীলতা ও অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়বে। খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও তা হুমকি।

সূত্র আরো জানায়, গত ১৬ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার একটি বাজারে অভিযান চালিয়ে অবৈধ ও নিষিদ্ধ ঘাসমারা কীটনাশক এবং নামিদামি ব্র্যান্ডের নকল মোড়কে সার মজুদের অভিযোগে এক ব্যবসায়ীকে এক মাসের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ওই অভিযানে জব্দ করা হয় প্রায় ৫ লাখ টাকা মূল্যের নকল ও ভেজাল সার-কীটনাশক। ১০ সেপ্টেম্বর কেরানীগঞ্জে নকল সার ও নিষিদ্ধ কীটনাশক তৈরি ও মোড়কজাতের অভিযোগে একজনকে দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। একই অভিযানে ৬টি ব্যক্তিমালিকানাধীন কারখানা থেকে জব্দের পর ধ্বংস করা হয় বিপুল পরিমাণ নকল সার ও কীটনাশক। একই দিনে অপর একটি কারখানায়ও অভিযান চালিয়ে নকল সার ও নিষিদ্ধ কীটনাশক জব্দ করা হয়। কারখানার মালিককে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় আর কারখানাটি সিলগালা করে দেয়া হয়। অভিযানে প্রায় ২৫০ বস্তা প্রস্তুতকৃত ভেজাল টিএসপি সার এবং সার তৈরির কাঁচামাল হিসেবে রাখা প্রায় ৩০০ বস্তা চুন, সিমেন্ট ও সিরামিক মাটি জব্দ করা হয়। তাছাড়া গত ২৭ আগস্ট রংপুরের পীরগাছা উপজেলার সৈয়দপুর বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে ভেজাল সার ও বালাইনাশক তৈরির কারখানার সন্ধান পায় প্রশাসন। সেখান থেকে বিভিন্ন নামিদামি কোম্পানির মোড়ক, কাঁচামাল ও সরঞ্জামসহ ৭২ বস্তা ভেজাল সার জব্দ করা হয়। একই দিন মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় ভেজাল সার বিক্রির অভিযোগে বিএডিসির এক ডিলারকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তার দোকান থেকে জব্দ করা হয় পাঁচ বস্তা ভেজাল সার। ১৮ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৮ আগস্ট ভেজাল কীটনাশক তৈরি ও প্যাকেটজাতের অভিযোগে এক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে এক বছরের কারাদণ্ড ও ৩ লাখ টাকা জরিমানা করেন। তার দোকান থেকে ৩০৭ বস্তা ভেজাল ইউরিয়া, ২৪৪ বস্তা এমওপি, ১৯ বস্তা ডিএপি ও তিন বস্তা টিএসপি সার জব্দ করা হয়। গত ৩০ জুলাই ভেজাল সার ও কীটনাশক তৈরি এবং প্যাকেটজাত করে বিক্রির অভিযোগে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় এক ব্যবসায়ীকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযানে তার দুটি গুদাম থেকে প্রায় ২০০ বস্তা সার তৈরির কাঁচামাল ও সরঞ্জাম এবং ১০ বস্তা নকল কীটনাশক জব্দ করা হয়। ১৩ জুলাই বীজের মোড়ক জালিয়াতি, মেয়াদোত্তীর্ণ কীটনাশকের মেয়াদ পরিবর্তন এবং ভেজাল কৃষিপণ্য বিক্রির অভিযোগে একটি প্রতিষ্ঠানকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এদিকে কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর সংশ্লিষ্টদের মতে, যেসব সারের মান খারাপ পাওয়া গেছে, সেগুলো বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর ভেজাল সার ব্যবহারে কৃষকের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বড় ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনা বা অন্য সহযোগিতার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে। পাশাপাশি ভেজাল সার বাজারজাত ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অন্যদিকে বাজারে বিক্রি হওয়া ভেজাল পণ্য নিয়ে কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম জানান, ভেজাল সার ও কীটনাশকের কিছু অভিযোগ আছে। তবে ভেজাল ওসব পণ্য দিয়ে কেউ যাতে কৃষকের সঙ্গে প্রতারণা করতে না পারে সেজন্য কৃষি কর্মকর্তারা কাজ করছেন। অভিযানের পাশাপাশি কোনো সার ও কীটনাশক নিয়ে সন্দেহ হলে সেগুলো ল্যাব টেস্টের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অনিয়ম পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। কৃষি বিভাগ এ বিষয়ে সতর্ক রয়েছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে