উঁচু মাপের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:২৯ এএম
উঁচু মাপের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো
ছবি: সংগ্রহীত

উঁচু মাপের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রতি বছরই সরকার দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে। আর ওই অর্থেই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের বড় অংশই নির্বাহ হচ্ছে। কিন্তু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক হিসাবের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের কাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে।  দেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হিসাবমান অনুসরণ করে প্রস্তুত করছে না পূর্ণাঙ্গ আর্থিক বিবরণী বা স্থিতিপত্র। এ অবস্থায় আড়ালেই থেকে যাচ্ছে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট সম্পদ, দীর্ঘমেয়াদি দায়, মূলধন এবং আর্থিক পরিসম্পদের প্রকৃত চিত্র। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও ২৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩২টি খাতে মোট ২ হাজার ৩৯৬ কোটি ৯৩ লাখ ৭১ হাজার ৮৯৮ টাকার অডিট আপত্তি তুলেছে। তার মধ্যে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম বা এসএফআই হিসেবে ৪০টি খাতকে চিহ্নিত করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েগুলোতে গুরুতর আর্থিক অনিয়মের পরিমাণ ৩৬৫ কোটি ১ লাখ ২১ হাজার ৮৬৮ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়োগ, অর্গানোগ্রামের বাইরে পদোন্নতি এবং প্রাপ্যতার অতিরিক্ত ভাতা প্রদানের মাধ্যমে অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে মিলেছে। আর দেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হিসাবমান অনুসরণ করে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করছে না। সরকারি বিশ্ববিদ্যালগুলোতে অর্গানোগ্রামের বাইরে পদোন্নতি দিয়ে অতিরিক্ত বেতন-ভাতা পরিশোধের ঘটনায় ৪৭ কোটি ৩৭ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩৮ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। আর বিধিবহির্ভূতভাবে উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতি ও আপগ্রেডেশন দেয়ায় অতিরিক্ত ৩ কোটি ৩১ লাখ ৫৪ হাজার ৮১৯ টাকা ব্যয় হয়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের তথ্য মিলেছে। বিজ্ঞপ্তিতে চাওয়া যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ দিয়ে বেতন-ভাতা পরিশোধ করায় ৩ কোটি ৪৩ লাখ ৫৬ হাজার ৮৬৪ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তাছাড়া অর্গানোগ্রামের বাইরে বা অতিরিক্ত পদে নিয়োগের মাধ্যমে আরো ৪৬ লাখ ৫০ হাজার ৪৪৭ টাকা ব্যয়ের আপত্তি রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ভাতার ক্ষেত্রেও প্রশ্ন উঠেছে বড় অঙ্কের অর্থ নিয়ে। প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিভিন্ন ভাতা দেয়ায় ৩২ কোটি ৭৪ লাখ ৬ হাজার ৩৪৮ টাকার আপত্তি এসেছে। তার মধ্যে শিক্ষকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব ভাতা বাবদ দেয়া ১০ কোটি ২৮ লাখ ৭৩ হাজার ৮৫৪ টাকা এবং বই ভাতা বাবদ ১ কোটি ৯৭ লাখ ৪০ হাজার ৫৭৭ টাকা রয়েছে। তাছাড়া নিরীক্ষায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিককাল ভাতা দেয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে। প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও ওই ধরনের ভাতা দেয়ায় আপত্তির পরিমাণ ৩৩ কোটি ৭৮ লাখ ৩ হাজার ৫৩৪ টাকা। একইভাবে প্রাপ্যতার অতিরিক্ত বা প্রাপ্যতা ছাড়াই সম্মানী দেয়ার ঘটনায় ৬৪ লাখ ৩ হাজার ৫৫৫ টাকার আপত্তি রয়েছে।

সুত্র জানায়, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা ও প্রশাসনিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত আর্থিক সুবিধা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও ডিন ভাতা হিসেবে ৫ কোটি ৫৩ লাখ ৮৯ হাজার ১৮৭ টাকা দেয়া হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিধিতে স্বশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গবেষণা ভাতা পাওয়ার বিধান নেই। তাছাড়া ধরা পড়েছে শিক্ষা ছুটিতে থাকা শিক্ষকদের ইনক্রিমেন্ট দেয়ার ঘটনাও। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এভাবে অতিরিক্ত বেতন দেয়ায় ১ কোটি ৯০ লাখ ১১ হাজার ৩৮৬ টাকা আর্থিক ক্ষতিা হয়েছে। আর বেতন-ভাতার বাইরে বাড়ি ভাড়া ও অবসর সুবিধা নিয়ে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের আপত্তি রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে বসবাস করেও নির্ধারিত হারের চেয়ে কম বাড়ি ভাড়া কর্তন করায় ২০ কোটি ৪২ লাখ ১৭ হাজার ২৯১ টাকা এবং প্রাপ্যের চেয়ে বেশি বাড়ি ভাড়া দেয়ায় ১৪ কোটি ৬২ লাখ ৮৫ হাজার ৫৫৬ টাকার আর্থিক ক্ষতির হিসাব করা হয়েছে। যেসব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে আর্থিক আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। তাছাড়া অডিট আপত্তির মুখে পড়েছে ইউজিসিও।

সূত্র আরো জানায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বাধীন বহিঃনিরীক্ষকের মাধ্যমে নিরীক্ষিত পূর্ণাঙ্গ আর্থিক বিবরণী জমা দিলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত আংশিক, অনিরীক্ষিত ও অসম্পূর্ণ হিসাব জমা দেয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেগুলো কেবল অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য তৈরি আয়-ব্যয়ের বিবরণী। অথচ আন্তর্জাতিক হিসাবমান অনুযায়ী একটি পূর্ণাঙ্গ আর্থিক প্রতিবেদনে ব্যালান্স শিট, আয় বিবরণী, নগদ প্রবাহ বিবরণী এবং নোটস টু অ্যাকাউন্টস থাকা বাধ্যতামূলক। ওসব অনুপস্থিত থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জমি, ভবন, গবেষণা অবকাঠামো, স্থায়ী সম্পদ, দায়-দেনা কিংবা ভবিষ্যত্ আর্থিক ঝুঁকির নির্ভরযোগ্য তথ্য মিলছে না। অথচ দেশের রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ পায়। সেজন্যই আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অবিলম্বে আন্তর্জাতিক গাইডলাইন মেনে স্থিতিপত্র তৈরি করতে হবে। কারণ দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে