ছোট শহর,বড় গুরুত্ব সৈয়দপুর যেন উত্তরাঞ্চলের এক স্বতন্ত্র শহরচিত্র

এফএনএস (ওবায়দুল ইসলাম; সৈয়দপুর, নীলফামারী) : | প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:২১ পিএম
ছোট শহর,বড় গুরুত্ব সৈয়দপুর যেন উত্তরাঞ্চলের এক স্বতন্ত্র শহরচিত্র

আয়তনে ছোট। অথচ গুরুত্বে বড়। নীলফামারী জেলার একটি উপজেলা শহর হলেও ব্যবসা-বাণিজ্য, রেল যোগাযোগ,শিল্প-কারখানা,শিক্ষা, সামরিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে সৈয়দপুরের গুরুত্ব অনেক বিস্তৃত। বহুভাষী ও বহুজাতিক সাংস্কৃতিক আবহ, রেলওয়ের ঐতিহ্য, শিল্পনগরী, সেনানিবাস, বিমানবন্দর ও উত্তরাঞ্চলের ব্যবসায়িক যোগাযোগ সব মিলিয়ে সৈয়দপুরকে বলা যায় উত্তরাঞ্চলের একটি স্বতন্ত্র শহরকেন্দ্র। অনেকের কাছে সৈয়দপুর ‘রেলের শহর’ হিসেবে পরিচিত। এর পেছনে রয়েছে ১৮৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত দেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা। ব্রিটিশ আমলে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়েকে কেন্দ্র করে যে জনপদের বিকাশ শুরু হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সেটিই পরিণত হয়েছে শিল্প ও বাণিজ্যনির্ভর ব্যস্ত শহরে।

সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা শুধু একটি কারখানা নয়, শহরটির অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিকাশের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ১১০ একরের বেশি জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই কারখানায় রেলওয়ের কোচ, বিভিন্ন যন্ত্রাংশের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কাজ হয়ে থাকে। বর্তমানে জনবল সংকট থাকলেও কারখানাটির ঐতিহাসিক ও কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।

রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্বাবধায়ক (ডিএস) এর দায়িত্বে আছেন শাহ সুফী নুর মোহাম্মদ। 

রেলওয়েকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। বিশেষ করে হালকা প্রকৌশল শিল্পে সৈয়দপুরের রয়েছে আলাদা পরিচিতি। স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো রেলওয়ের বিভিন্ন যন্ত্রাংশসহ নানা ধরনের ধাতব পণ্য তৈরি করছে। এ শিল্পে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে এর বড় ভূমিকা রয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে বিসিক শিল্পনগরী, ছোট-বড় বিভিন্ন কলকারখানা, গ্যাস ডিপো, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ধরনের পাইকারি বাজার। ফলে আয়তনে ছোট হলেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ঘনত্ব এখানে উল্লেখযোগ্য।

২২ উর্দুভাষী ক্যাম্পে ভিন্ন এক সামাজিক বাস্তবতা সৈয়দপুরের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য এর বহুভাষী ও বহুসাংস্কৃতিক জনজীবন। শহরে ২২টি উর্দুভাষী ক্যাম্প রয়েছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এসব ক্যাম্পে ৪ হাজার ৫৩০টি পরিবারের প্রায় ১৯ হাজার ৬৯৭ জন মানুষের বসবাসের তথ্য দেওয়া হয়েছে।

ক্যাম্পগুলো সৈয়দপুরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র শিল্প ও কুটিরশিল্পে ক্যাম্পের নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। আগরবাতি তৈরির মতো কাজে কয়েক হাজার নারী যুক্ত থাকার তথ্যও  এসেছে। সম্প্রতি উর্দুভাষী ক্যাম্পের বাসিন্দারা নিজেদের ‘উর্দুভাষী বাংলাদেশি’ হিসেবে স্বীকৃতি, মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসনসহ বিভিন্ন দাবি তুলেছেন। 

শিক্ষাক্ষেত্রেও সৈয়দপুরের রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য। সৈয়দপুর সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৩ সালে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এটি সৈয়দপুর শহর ও নীলফামারী জেলার প্রথম কলেজ। ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি সরকারিকরণ করা হয়। এ ছাড়া ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত সৈয়দপুর হাই স্কুলসহ বিভিন্ন পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা ও আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শহরের শিক্ষাক্ষেত্রকে সমৃদ্ধ করেছে। সৈয়দপুরে রয়েছে সেনানিবাস, আর্মি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি, রেলওয়ে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, রেলওয়ে জেলা পুলিশ, বেতার কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। রয়েছে সৈয়দপুর বিমানবন্দরও, যা উত্তরাঞ্চলের আকাশপথের যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

নীলফামারী জেলার ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র সৈয়দপুর। দেশের বিভিন্ন জেলার সঙ্গে সড়ক ও রেলপথে যোগাযোগের কারণে প্রতিদিন এখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ আসা-যাওয়া করেন। সৈয়দপুরের সঙ্গে নীলফামারী ছাড়াও দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার সরাসরি ব্যবসায়িক যোগাযোগ রয়েছে।

বাস-মিনিবাস পরিবহন খাতেও সৈয়দপুরের রয়েছে জেলা পর্যায়ের গুরুত্ব। জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যক্রম এখান থেকে পরিচালিত হয়। শহরের নিয়ামতপুর বাস টার্মিনাল উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন রুটের যাত্রী ও পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। শহরে দেশের অন্যতম বড় শুকনা মাছের পাইকারি বাজারও গড়ে উঠেছে। ফলে মাছ, কৃষিপণ্য, পোশাক, যন্ত্রাংশ, নির্মাণসামগ্রীসহ নানা ধরনের পণ্যের বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে প্রতিদিনই সরগরম থাকে সৈয়দপুরের বাজার।

সৈয়দপুরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো এর আকার। শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে খুব বেশি সময় লাগে না। পায়ে হেঁটে শহরের উল্লেখযোগ্য অনেক এলাকা ঘুরে দেখা সম্ভব; রিকশায় আরও কম সময়ে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাওয়া যায়।

কিন্তু এই ছোট পরিসরের মধ্যেই রয়েছে রেলওয়ে কারখানা, বাজার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সেনানিবাস, আবাসিক এলাকা, ক্যাম্প, পরিবহনকেন্দ্র ও সরকারি-বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ আয়তনে ছোট হলেও কার্যক্রমের দিক থেকে সৈয়দপুর একটি ঘনবসতিপূর্ণ ও কর্মচঞ্চল শহরকেন্দ্র। সৈয়দপুর পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৮ সালে এবং এটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভা। বর্তমানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ফারাহ ফাতেহা তাকমিলা। পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়নকাজ, সড়ক ও ড্রেন সংস্কার, নাগরিক সেবা এবং শহরের অবকাঠামো উন্নয়নে প্রশাসনের পাশাপাশি পৌরসভার প্রকৌশল শাখা কাজ করছে। সৈয়দপুর উপজেলায় রয়েছে পাঁচটি ইউনিয়ন এবং একটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভা। শহরের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও ভূমিকা রয়েছে। পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর ‘শ্রেষ্ঠ কাউন্সিলর’ হিসেবে উপাধি পাওয়া আক্তার হোসেন ফেকুর নামও স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য। শিল্প, রেল ও বাণিজ্যের পাশাপাশি সৈয়দপুরের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনাতেও রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। বর্তমানে সৈয়দপুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার এ কে এম মোহাম্মদ ওহিদুন্নবী এবং সৈয়দপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. রেজাউল করিম রেজা দায়িত্ব পালন করছেন। এদিকে সৈয়দপুরকে জেলা করা হোক এ দাবিও রয়েছে জনগনের। তবে দাবির মধ্যে পাশের থানা পার্বতীপুর,চিরিরবন্দর,খানসামা,কিশোরগঞ্জ, তারাগগঞ্জ ও সৈয়য়পুর একত্রিত করে জেলা করা যেতে পারে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে