ময়মনসিংহের ত্রিশালে ২ কোটি ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি গ্রামীণ সড়কের কার্পেটিং নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সদ্য কার্পেটিং করা সড়কে হাত দিয়ে ঘষা দিলেই উঠে আসছে পিচের আস্তরণ। কোথাও কোথাও পা দিয়ে চাপ দিলেও কার্পেটিং আলগা হয়ে যাচ্ছে। নির্মাণের এক দিনের মধ্যেই এমন পরিস্থিতিতে ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাদের অভিযোগ, কাজের মান নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত তদারকির ঘাটতির কারণেই সড়কটির এমন দশা হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নির্মাণকাজ চলাকালে নিয়মিত খোঁজখবর রাখলে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার কিংবা অনুপযুক্ত পরিবেশে কার্পেটিং করার সুযোগ থাকত না বলেও দাবি স্থানীয়দের।
উপজেলার বালিপাড়া ইউনিয়নের ধলা খানবাড়ী তিন রাস্তার মোড় থেকে নির্মাণাধীন ২ হাজার ৩৯৮ মিটার সড়কটির প্রায় এক হাজার মিটার অংশের কার্পেটিংয়ের কাজ সম্প্রতি শেষ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স বাপ্পি এন্টারপ্রাইজ। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার মাত্র এক দিনের মাথায় বিভিন্ন স্থানে কার্পেটিং উঠে আসার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) গ্রামীণ সড়ক প্রকল্পের আওতায় সড়কটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ পরবর্তীতে বৃদ্ধি করা হয়েছে। সড়কটির নির্মাণ/সংস্কার কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ টাকা।
বৃষ্টির মধ্যে কার্পেটিংয়ের অভিযোগ
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ধলা খানবাড়ী তিন রাস্তার মোড় এলাকায় সদ্য কার্পেটিং করা সড়কের বিভিন্ন অংশে হাত দিয়ে ঘষা দিলে পিচ ও কার্পেটিংয়ের স্তর উঠে আসছে। স্থানীয়রা জানান, কাজ চলার সময় বৃষ্টিও হচ্ছিল। বৃষ্টির মধ্যেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সড়কের কার্পেটিংয়ের কাজ চালিয়ে যায় বলে তাদের অভিযোগ।
এ সময় স্থানীয়রা কাজের মান নিয়ে আপত্তি জানান। পরে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে প্রচার করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এরপর উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. রোকন আল ইবনে মাহাদী ঘটনাস্থলে গিয়ে সড়কটি পরিদর্শন করেন।
নিয়মিত তদারকি ছিল কি?
স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কটির নির্মাণকাজ চলাকালে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও মাঠপর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়মিত উপস্থিতি ও তদারকি ছিল না। তাদের দাবি, কাজের প্রতিটি ধাপে উপকরণের মান, স্তরের পুরুত্ব, মিশ্রণের অনুপাত এবং কার্পেটিংয়ের উপযুক্ততা যাচাই করা প্রয়োজন হলেও তা যথাযথভাবে হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রকৌশলীদের নিয়মিত তদারকি থাকলে কাজের ক্রুটি নির্মাণের সময়ই শনাক্ত করে সংশোধনের সুযোগ ছিল। এখন কাজ শেষ হওয়ার পর কার্পেটিং উঠে আসায় পুরো প্রকল্পের মান নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
“ইটখোয়া-বালু-পাথর ঠিকমতো দেওয়া হয়নি”
এলাকাবাসীর অভিযোগ, মাটি লেভেল করার পর প্রয়োজনীয় ইটখোয়া, বালু ও পাথরের স্তর যথাযথভাবে প্রস্তুত না করেই কার্পেটিং করা হয়েছে। ফলে সড়কের সঙ্গে কার্পেটিংয়ের যথাযথ বন্ধন তৈরি হয়নি। এ কারণে সামান্য চাপেই পিচ উঠে আসছে বলে তাদের দাবি।
তারা আরও অভিযোগ করেন, সড়কের বিভিন্ন স্থানে ছোট যানবাহন চলাচল করলেই চাপ পড়ে যাচ্ছে। ভারী যানবাহন চলাচল শুরু হলে সড়কটি আরও দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
এলাকাবাসীর ক্ষোভ
স্থানীয় বাসিন্দা আতাহারুল ইসলাম বলেন, “পা দিয়ে চাপ দিলেই কার্পেটিং উঠে যাচ্ছে। নতুন সড়কে কোনোভাবেই এমন হওয়ার কথা নয়। নির্মাণকাজের সময় আমরা প্রতিবাদ করলেও কোনো কাজে আসেনি।”
স্থানীয় বাসিন্দা মো. এখলাস আলী বলেন, “সড়কে প্রয়োজনীয় উপকরণ যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়নি বলেই কার্পেটিং উঠে যাচ্ছে বলে আমাদের মনে হচ্ছে। এখনই যদি এমন অবস্থা হয়, ট্রাক চলাচল শুরু হলে সড়কে কিছুই থাকবে না।”
এলাকাবাসী বলছেন, সরকারি অর্থে নির্মিত একটি সড়ক যদি নির্মাণের পরপরই নষ্ট হতে শুরু করে, তাহলে কিছুদিন পর পুনরায় সংস্কারের প্রয়োজন হতে পারে। এতে জনগণের দুর্ভোগের পাশাপাশি সরকারি অর্থের অপচয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
ঠিকাদারের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মেসার্স বাপ্পি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. মাজহারুল ইসলাম-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী কাজ করা হয়েছে। কার্পেটিং উঠে গেলে আমার কি করার আছে। কিছু বুঝার বাকি থাকলে ইঞ্জিনিয়ারের সাথে যোগাযোগ করুন।
প্রকৌশল বিভাগের বক্তব্য
ত্রিশাল উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মো. যুবায়েত হোসেন বলেন, “সড়কের অনিয়মের বিষয়টি আমি ইতোমধ্যে অবগত আছি। সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এখন এলাকাবাসীর প্রশ্ন প্রায় আড়াই কোটি টাকার কাছাকাছি ব্যয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের কাজ চলাকালে মান নিয়ন্ত্রণ ও মাঠপর্যায়ের তদারকি কতটা কার্যকর ছিল? নির্মাণের এক দিনের মধ্যেই যদি কার্পেটিং উঠে যায়, তাহলে প্রকল্পের অন্যান্য অংশের কাজের মানও কি পরীক্ষা করা হয়েছে?
এলাকাবাসী সড়কটির পুরো অংশের কাজ কারিগরি পরীক্ষা, ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর মান যাচাই, কাজের পুরুত্ব ও প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী বাস্তবায়ন হয়েছে কি না তা পরীক্ষা এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তাদের মতে, শুধু উঠে যাওয়া কার্পেটিং পুনরায় বিছিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কেন এমন হলো, কার তদারকিতে কাজ হয়েছে এবং সরকারি অর্থের বিনিময়ে প্রকল্পের নির্ধারিত মান নিশ্চিত করা হয়েছে কি না সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।