বরিশাল বিভাগের ২ হাজার ৫৯৯ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক

এফএনএস (বরিশাল প্রতিবেদক) : | প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:৫০ পিএম
বরিশাল বিভাগের ২ হাজার ৫৯৯ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক

বিদ্যালয় আছে, শিক্ষার্থী আছে। শিক্ষকও আছেন। কিন্তু নেই বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক। বরিশাল বিভাগের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর বড় একটি অংশে এভাবেই চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের ৬ হাজার ২৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২ হাজার ৫৯৯টিতেই নেই প্রধানশিক্ষক। অর্থাৎ প্রতি ১০টি বিদ্যালয়ের প্রায় চারটিই চলছে প্রধানশিক্ষক ছাড়াই। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সহকারি শিক্ষক সংকট। ছয় জেলায় সহকারী শিক্ষকের ৩ হাজার ২৯টি পদ শূন্য।

শুধু বিদ্যালয়েই নয়, প্রাথমিক শিক্ষার মাঠপর্যায়ের তদারকিও ব্যবস্থাতে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের জনবল সংকট। ছয় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৭০টি পদের মধ্যে ৩১টি এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসগুলোতে ৫৩৯টি পদের মধ্যে ৩১৩টিই শূন্য। ফলে বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব, শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক এবং প্রশাসনিক তদারকি প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ তিন স্তরেই তৈরি হয়েছে বড় শূন্যতা।

বরিশাল বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষার উপ-পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ বরিশাল জেলায়। জেলার ১ হাজার ৫৮৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৯৩৩টিতেই প্রধানশিক্ষক নেই। অর্থাৎ জেলার অর্ধেকেরও বেশি বিদ্যালয় চলছে প্রধানশিক্ষক ছাড়াই।

উপজেলা ভিত্তিক তথ্যেও সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্ট। আগৈলঝাড়ায় ৯৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬০টিতে, উজিরপুরে ১৮১টির মধ্যে ১১১টিতে, গৌরনদীতে ১৩১টির মধ্যে ৯০টিতে, বরিশাল সদরে ২০১টির মধ্যে ৭২টিতে, বাকেরগঞ্জে ২৭৯টির মধ্যে ১৮১টিতে, বানারীপাড়ায় ১২৬টির মধ্যে ৮৭টিতে, বাবুগঞ্জে ১৩৪টির মধ্যে ৭৬টিতে, মুলাদীতে ১৩৯টির মধ্যে ৯০টিতে, মেহেন্দীগঞ্জে ২০৮টির মধ্যে ১১৩টিতে এবং হিজলা উপজেলার ৯২টির মধ্যে ৫৩টি বিদ্যালয়ে প্রধানশিক্ষক নেই।

বিভাগের অন্য পাঁচ জেলার চিত্র খুব একটা ভিন্ন নয়। পটুয়াখালীর ১ হাজার ২৩৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৯১টিতে, পিরোজপুরের ৯৮৯টির মধ্যে ৩৪০টিতে, ভোলার ১ হাজার ৪৭টির মধ্যে ৪২৮টিতে, বরগুনার ৭৯৯টির মধ্যে ৩০৬টিতে এবং ঝালকাঠির ৫৮৫টির মধ্যে ২০৯টি বিদ্যালয়ে নেই প্রধানশিক্ষক।

তবে শূন্য পদ থাকলেও সব বিদ্যালয় যে প্রধানশিক্ষকহীন, তা নয়। বিভাগের ৩ হাজার ৬৪৪টি বিদ্যালয়ে প্রধানশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন শিক্ষক। তাদের মধ্যে ১ হাজার ১৪ জনই আছেন চলতি দায়িত্বে। অর্থাৎ স্থায়ী প্রধানশিক্ষক নিয়োগ বা পদোন্নতির বদলে বছরের পর বছর অস্থায়ী ব্যবস্থায় বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব সামলানো হচ্ছে।

প্রধানশিক্ষক একটি বিদ্যালয়ের শুধু প্রশাসনিক প্রধান নন। শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসছেন কি না, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ঠিকভাবে হচ্ছে কি না, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি কেমন, বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ও একাডেমিক কার্যক্রম এসবের তদারকির মূল দায়িত্ব তার। ফলে দীর্ঘদিন ধরে পদটি শূন্য থাকায় বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রম কতোটা কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

এর সাথে যোগ হয়েছে সহকারি শিক্ষক সংকট। ছয় জেলায় সহকারি শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ৩৩ হাজার ১২৩টি। কর্মরত আছেন ৩০ হাজার ৯৪ জন। ফলে শূন্য রয়েছে ৩ হাজার ২৯টি পদ। এরমধ্যে বরিশালে ৬২৯টি, পটুয়াখালীতে ৭৭৫টি, পিরোজপুরে ৪৯৬টি, ভোলায় ৪৬৪টি, বরগুনায় ৩৮০টি এবং ঝালকাঠিতে ২৮৫টি পদ শূন্য। হঅর্থাৎ কোথাও প্রধানশিক্ষক নেই, কোথাও সহকারি শিক্ষক কম, আবার কোন বিদ্যালয়ে দুই ধরনের সংকটই রয়েছে। এতে কর্মরত শিক্ষকদের ওপর বাড়ছে কাজের চাঁপ। শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া, নিয়মিত পাঠদান এবং পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের আলাদা করে নজর দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোও এতে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান শাহিন বলেন, ২০০৯ সাল থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষকদের প্রধানশিক্ষক পদে পদোন্নতি বন্ধ রয়েছে। ২০১৭ সালে কিছু জ্যেষ্ঠ সহকারি শিক্ষককে প্রধানশিক্ষকের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হলেও তাদের স্থায়ীভাবে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। এরমধ্যে অনেকে অবসরে গেছেন, অনেকে মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু শূন্য পদগুলো পূরণে নতুন করে পদোন্নতির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।

তিনি বলেন, বছরের পর বছর প্রধানশিক্ষক পদ শূন্য থাকায় বিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষকদের তদারকি, প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা এবং পাঠদানের মান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পরেছে। দ্রুত পদোন্নতির মাধ্যমে শূন্য পদ পূরণ না করলে সংকট আরও বাড়বে। বিদ্যালয়ের বাহিরে তদারকি ব্যবস্থাতেও জনবল সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিভাগের ছয় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৭০টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৩৯ জন। শূন্য রয়েছে ৩১টি পদ। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসগুলোতে ৫৩৯টি পদের বিপরীতে কর্মরত ২২৬ জন। শূন্য ৩১৩টি পদ। বিভাগীয় উপ-পরিচালকের কার্যালয়েও ১৪টি পদের মধ্যে পাঁচটি শূন্য। সচেতন শিক্ষানুরাগীরা বলেছনে, প্রাথমিক শিক্ষার মাঠপর্যায়ের তদারকির দায়িত্ব যাদের, তাদেরই যদি বড় অংশের পদ শূন্য থাকে, তাহলে বিদ্যালয় পরিদর্শন, শিক্ষকদের জবাবদিহি এবং শিক্ষার মান পর্যবেক্ষণ কতোটা কার্যকরভাবে হচ্ছে।

এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)'র বরিশাল জেলার সাধারণ সম্পাদক রনজিৎ দত্ত বলেন, এটিকে শুধু শূন্য পদের হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সরাসরি প্রভাব পরছে একটি প্রজন্মের শিক্ষার ওপর। দ্রুত প্রধানশিক্ষক ও সহকারি শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষা অফিসের শূন্য পদ পূরণ, নিয়মিত বিদ্যালয় পরিদর্শন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরির প্রাথমিক স্তরে এমন অব্যবস্থাপনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বরিশাল বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মীর জাহিদুল কবির তুহিন বলেন, পুরো বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু হলে সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে