হাসিনাকে ফেরত না দেওয়ায় ভারতের বিরুদ্ধে ‘চক্রান্তের’ অভিযোগ রিজভীর

নিজস্ব প্রতিবেদন | প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:৪৩ পিএম
হাসিনাকে ফেরত না দেওয়ায় ভারতের বিরুদ্ধে ‘চক্রান্তের’ অভিযোগ রিজভীর
ছবি: সংগ্রহীত

শেখ হাসিনাসহ গণহত্যায় অভিযুক্তদের বাংলাদেশে ফেরত না দিয়ে ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চক্রান্তের জাল বিস্তার করছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। একই সঙ্গে ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা দেখা দেওয়ার ঘটনাকেও তিনি ‘কূটকৌশল’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল ও প্রজন্ম দলের উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন রিজভী। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বুধবার ছিল, ক্যালেন্ডার হিসাবেও তার সঙ্গে মিল রয়েছে।

রিজভী বলেন, শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের ফেরত চেয়ে বাংলাদেশ সরকার বারবার তাগাদা দিলেও ভারত তা মানছে না। তার অভিযোগ, ভারতের পক্ষ থেকে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা বলা হলেও শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরনের অবস্থান নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আপনারা (ভারত) তো আমাদের বন্ধু দেশ দাবি করেন, আমরাও বলি। কিন্তু কেমন বন্ধু আপনারা? যিনি একাত্তরের পরে ১৪০০ তরুণ-কিশোর, ছাত্র-জনতা ও শ্রমিকের রক্ত পান করেছেন, সেই রক্তপিপাসু শেখ হাসিনাকে আপনারা আশ্রয় দিয়েছেন।’

শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত এক সাবেক মেজরের প্রসঙ্গ টেনে রিজভী বলেন, ‘আপনারা যদি সেই সাবেক মেজরকে ধরে শেখ হাসিনার কাছে হস্তান্তর করতে পারেন, তাহলে ১৪০০ মানুষকে হত্যাকারী শেখ হাসিনাকে কেন হস্তান্তর করছেন না? তাকে নিয়ে আপনাদের উদ্দেশ্য কী? নিশ্চয়ই কোনো গভীর চক্রান্ত আছে।’

তার দাবি, ভারত শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। রিজভী বলেন, ‘মুখে বন্ধুত্বের সুমধুর কথা বললেও ভেতরে ভেতরে শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে আপনারা চক্রান্তের জাল বুনছেন।’

ব্রিকসে না যাওয়ার পর আদানির বিদ্যুৎ নিয়ে প্রশ্ন

ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গেও কথা বলেন রিজভী। তার ভাষ্য, বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে যথাযথ মর্যাদায় আমন্ত্রণ না জানিয়ে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ‘সাইডলাইনে বসার মতো’ করে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তিনি বলেন, এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করা প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদার বিষয়।

রিজভীর অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী ব্রিকস সম্মেলনে যাবেন না বলে সিদ্ধান্ত জানানোর পরদিনই ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানি পাওয়ারের কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা দেখা দেয়। এ ঘটনাকে তিনি কূটকৌশল হিসেবে দেখছেন।

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ব্রিকসে যাবেন না বলার পরদিনই আদানি পাওয়ার প্ল্যান্ট ঘোষণা দিল তাদের ইউনিট নষ্ট হয়ে গেছে। এই সুইচ তো ভারতের ঝাড়খণ্ডে, তারা যখন ইচ্ছা বন্ধ করে। এই কূটকৌশল বোঝার জন্য ব্যারিস্টারি পাশ বা পিএইচডি করতে হয় না, দেশের সাধারণ মানুষও তা বোঝে।’

এর আগে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন মহলে কারিগরি ত্রুটি নাকি অন্য কোনো কারণ, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে রিজভীর বক্তব্যকে তার রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই উপস্থাপন করা হচ্ছে।

‘বিরোধী মতের ওপর জুলুম নেই’

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের সমালোচনা করে রিজভী বলেন, গত ১৬ বছরে দেশে লুণ্ঠন, অর্থ পাচার, গুম ও গুপ্তহত্যা হয়েছে। তার দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়েছে।

বর্তমান সরকারের সময়ে বিরোধী মত প্রকাশের সুযোগ রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। রিজভী বলেন, ‘আজকে পার্লামেন্টে এবং বাইরে বিরোধী দল সকাল-সন্ধ্যা সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার ও গালিগালাজ করছে। কিন্তু কোনো বিরোধী নেতা কি গুম হয়েছেন? কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যা হয়েছে? হয়নি।’

তার ভাষ্য, জনগণের বাকস্বাধীনতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করাই বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার।

গ্যাস সংকট নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরলেন

দেশের গ্যাস ও জ্বালানি সংকট নিয়েও বক্তব্য দেন বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, বর্তমান সংকট সরকারের তৈরি নয়। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

রিজভী বলেন, সংকট মোকাবিলায় সরকার বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস আমদানির চেষ্টা করছে। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির মাধ্যমে শিল্প-কারখানা ও গৃহস্থালিতে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

এ সময় দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের ইতিবাচক দিক তুলে ধরে রিজভী দাবি করেন, বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও রেমিট্যান্সের প্রবাহ বেড়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

মধুর ক্যান্টিন নিয়েও রিজভীর ক্ষোভ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক নিয়েও কথা বলেন রিজভী। তিনি অভিযোগ করেন, একাত্তরের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত স্থাপনাগুলোর পরিচয় পরিবর্তনের কোনো চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না।

রিজভী বলেন, ‘মধুর ক্যান্টিনকে “বিশ্রাম মঞ্জিল” বানানোর চেষ্টা শহীদ মধুর আত্মত্যাগের প্রতি চরম অপমান। মধুর ক্যান্টিনের মধু একাত্তরের শহীদ।’

তিনি আরও বলেন, একাত্তরের পরাজিত শক্তি ভিন্ন কৌশলে প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করলে মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা ও মুক্তিযোদ্ধারা তা প্রতিহত করবে।

মানববন্ধনে মুক্তিযোদ্ধা দলের সহসভাপতি কর্নেল (অব.) জয়নুল আবেদীন, আনিসুজ্জামান খোকন, মেজর (অব.) মিজানসহ মুক্তিযোদ্ধা দল ও প্রজন্ম দলের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে