ইঞ্জিন সঙ্কটে তলানিতে রেলপথে পণ্য পরিবহন

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:১০ এএম
ইঞ্জিন সঙ্কটে তলানিতে রেলপথে পণ্য পরিবহন

ইঞ্জিন সঙ্কটে তলানিতে নেমেছে রেলপথে পণ্য পরিবহন। অথচ পণ্যবাহী ট্রেনগুলো লোকসানী রেলওয়ের মুনাফা বাড়ায়। একই সাথে দেশের সার্বিক অর্থনীতিও অবদান রাখে। কিন্তু বিগত ৫ বছরে রেলপথে পণ্যবাহী ট্রেনের সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। অথচ এর সাথে দেশের আমদানি-রফতানি, জ্বালানি, কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তার পণ্য পরিবহন সেবা জড়িত। মূলত রেলপথে পণ্যবাহী ট্রেনের চাহিদার তুলনায় কম ইঞ্জিন বা লোকোমোটিভ সরবরাহ করা হয়। আর বর্তমানে নিয়মিত বরাদ্দের তুলনায় ৭৫ শতাংশ কম ইঞ্জিন সরবরাহে রেলপথে পণ্য পরিবহন নাজুক হয়ে পড়েছে। কারণ রাষ্ট্রায়ত্ত সর্ববৃহৎ পরিবহন সার্ভিস রেলের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর, ঢাকার কমলাপুর আইসিডি, সিলেট, রংপুর, দিনাজপুর, শ্রীমঙ্গল ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র, জ্বালানি ডিপো ও খাদ্যশস্য মজুদাগার সংযুক্ত রয়েছে। যাতে নৌ-সড়ক পথের দীর্ঘ রুট ও ব্যয়বহুল এলাকায় জ্বালানি, সার, কৃষিপণ্য, পাথরসহ নির্মাণসামগ্রী রেলপথে সহজে পরিবহন করা যায়। কিন্তু লোকোমোটিভের তীব্র সংকট রেলপথে পণ্য পরিবহন তলানিতে নেমেছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, রেলপথে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা গত অর্থবছরের চেয়েও চলতি অর্থবছর সংকটময় অবস্থায় রয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার কমলাপুর আইসিডিতে ১ আগস্ট ২৭ আগস্ট পর্যন্ত মাত্র ১৯টি কনটেইনারবাহী ট্রেন চলেছে আর কমলাপুর আইসিডি থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে ২০টি ট্রিপ পরিচালনা করা হয়। তার মধ্যে গত কয়েকদিন ধরে লোকোমোটিভ বিকল হয়ে আটকে রয়েছে ঢাকাগামী একটি কনটেইনার ট্রেন। অথচ ২৭ আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর অভ্যন্তরে আমদানি কনটেইনারের মজুদ বেড়েছে। দুই সপ্তাহ ধরে চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ডে (সিজিপিওয়াই) ৪৮১টি কনটেইনার লোডেড অবস্থায় অপেক্ষমাণ। অথচ পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য গত অর্থবছরেও দৈনিক ৪টির মতো সরবরাহ হলেও ২৭ আগস্ট পর্যন্ত প্রতি দুদিনে তিনটি লোকোমোটিভ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে রেলওয়ের পরিবহন বিভাগ পণ্যবাহী ট্রেনই পরিচালনা হিমশিম খাচ্ছে। 

সূত্র জানায়, করোনাকালে অর্থাৎ ২০২১-২২ অর্থবছরেও রেলওয়ে ৩৬৫ দিনে ২ হাজার ৭৭০ ট্রিপ পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা করেছে। ওই সময়ে প্রতিদিন গড়ে ৯ দশমিক ৯১ লোকোমোটিভ সরবরাহের বিপরীতে ৭ দশমিক ৫৯ ট্রিপ পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা করা হয়। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল বার্ষিক ২ হাজার ৮৭৮ ট্রিপ পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা করে। ওই বছর দৈনিক রেকর্ড ১১ দশমিক ৬৮টি লোকোমোটিভ সরবরাহ মিলেছিলো। তাছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দৈনিক গড়ে ৮ দশমিক ৭৯টি লোকোমোটিভ দিয়ে দৈনিক ৭ দশমিক ২১ ট্রিপ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দৈনিক গড়ে ৬ দশমিক ১৫টি লোকোমোটিভ দিয়ে ৫ দশমিক ৮৮ ট্রিপ পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা করা হয়। আর  সর্বশেষ অর্থবছরে দৈনিক সরবরাহ করা লোকোমোটিভের সংখ্যা ২০২১-২২ অর্থবছরের তুলনায় ৭৫ শতাংশ কমে ৩ দশমিক ১৪টি হয়েছে। তাতে দৈনিক পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলের সংখ্যা নেমে আসে ৪ দশমিক শূন্য ২ ট্রিপে।  বর্তমানে দৈনিক লোকোমোটিভ সরবরাহ ১ দশমিক ৫টিতে নেমে আসায় পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল স্মরণকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। যা দেশের রেলনির্ভর পণ্য সরবরাহ ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি করছে।

সূত্র আরো জানায়, রেলপথে পণ্য পরিবহন খাতে উদাসীনতা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে তীব্র চাহিদা থাকা সত্ত্বেও রেলওয়ে পরিচালনা করতে পারছে না কনটেইনার, জ্বালানি, খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী ট্রেন। এ অবস্থায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বুকিং দিয়েও পণ্যবাহী ট্রেনের সেবা পাচ্ছে না। এমন অতি সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ রেলওয়েকে কনটেইনার জটের কথা উল্লেখ করে চিঠিও দিয়েছে। তাতে দ্রুত সময়ের মধ্যে মজুদ কনটেইনার পরিবহন করতে না পারলে বন্দরের কনটেইনার জটসহ ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের ক্ষতির কথা জানানো হয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, রেলওয়ে সব সময়ই নির্ভরযোগ্য রাষ্ট্রীয় পণ্য পরিবহন সংস্থা। কমলাপুর আইডিসির মাধ্যমে পণ্য আমদানি ও রফতানির সুযোগ থাকায় অনেক ব্যবসায়ী রেলপথেই কনটেইনার পরিবহন করতে আগ্রহী। কিন্তু বর্তমানে রেলের মাধ্যমে কনটেইনার পরিবহনে সময়ক্ষেপণ হওয়ায় ব্যবসায়ীদের পণ্য আমদানিতে লোকসান হচ্ছে। কারণ অনেক সময় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিপমেন্ট দেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও চট্টগ্রামের বাইরের পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলেও রেলপথে কনটেইনারে পণ্য নিতে পারে না। অথচ দেশের সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্যের গতিধারা বজায় রাখতে কনটেইনারবাহী ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করা জরুরি।

এদিকে রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের মতে, রেলের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে নীতিনির্ধারণী পর্যায় আগ্রহী হলেও অজানা কারণে লোকোমোটিভ ও ওয়াগন-ক্যারেজ আমদানিতে তাড়া নেই। চট্টগ্রাম-দোহাজারী ডাবল লাইন প্রকল্পের অধীনে ৩০টি মিটার গেজ লোকোমোটিভ আমদানির কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হতে আরো অন্তত তিন বছর সময় লাগবে। তাছাড়া রেলের যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগ স্বাভাবিক সময়েও পণ্য খাতে লোকোমোটিভ সরবরাহ দিতে কৃচ্ছ্রতা দেখিয়ে আসছে। আর বর্তমানে রেলের লোকোমোটিভের সংকটে যাত্রীবাহী ট্রেনের অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় পণ্য খাতে লোকোমোটিভ সরবরাহ কার্যত শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হয়েছে। এ পরিস্থিতি চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তর ও পোর্ট ইয়ার্ডে কনটেইনারসহ বিভিন্ন পণ্যের স্তূপ বেড়ে সংকট তীব্র করবে। যা দেশের জ্বালানি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের সংকটময় সময়ে বড় ধরনের অর্থনৈতিক অচলাবস্থা তৈরির শঙ্কা বাড়ায়।

অন্যদিকে রেলের বাণিজ্যিক বিভাগ ও পরিবহন বিভাগ চাহিদার ভিত্তিতে নিয়মিত যাত্রীবাহী ট্রেনের পাশাপাশি পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে চায়। বিগত দেড় দশকে সরকার রেল খাতে দেড় লাখ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু ট্র্যাক ও অবকাঠামো খাতে বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও রেলওয়ে লোকোমোটিভ আমদানি হয়নি। সর্বশেষ ২০২০ সালে কোরিয়ান হুন্দাই রোটেম থেকে ৩০টি মিটার গেজ লোকোমোটিভ ক্রয় করা হয়। চুক্তিতে টিএ-১২ মডেলের আধুনিক অল্টারনেটর সংযোজনের কথা থাকলেও সরবরাহ করা ১০টি ইঞ্জিনে অপেক্ষাকৃত পুরনো ও কম ক্ষমতাসম্পন্ন টিএ-৯ মডেলের অল্টারনেটর সংযোজন করা হয়। আর চুক্তি-বহির্ভূত যন্ত্রাংশ ব্যবহারের ফলে ইঞ্জিনগুলোর কাঙ্ক্ষিত গতি, হর্সপাওয়ার ও ব্যাকআপ ক্ষমতা কমে যায়। বর্তমানে ওসব লোকোমোটিভের মধ্যে ১৫টিরও বেশি চারটির পরিবর্তে দুটি মোটরে চলাচল করছে। মূলত ২০২৩-২৪ সালের দিকে দেশে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সময় সর্বশেষ আমদানি করা ৩০০০ সিরিজের লোকোমোটিভসহ বিভিন্ন পুরনো লোকোমোটিভের যন্ত্রাংশ রেলওয়ে আমদানি করতে পারেনি। ফলে রেলওয়ে লোকোমোটিভ আমদানি কিংবা বিদ্যমান লোকোমোটিভ সংস্কার করতে পারেনি। বর্তমানে রেলের প্রায় প্রতিটি ট্রেনই যাত্রা শুরু ও গন্তব্যে পৌঁছতে বিলম্ব করছে। পাশাপাশি প্রতিদিনই পথিমধ্যে লোকোমোটিভ বিকল হওয়ার ঘটনা ঘটছে। 

এ বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজার (ডিআরএম-চট্টগ্রাম) মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁয়া জানান, রেলওয়ে সব সময় যাত্রীর পাশাপাশি পণ্যবাহী সেবাও বাড়াতে চায়। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে লোকোমোটিভ, যন্ত্রাংশ আমদানিসহ বিভিন্ন বিষয়ে সময়ক্ষেপণ হয়। রেলওয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিদ্যমান লোকোমোটিভ মেরামতসহ বেশকিছু প্রকল্পের মাধ্যমে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। আশা করা যায় অচিরেই রেলের লোকোমোটিভ সংকট নিরসন করে যাত্রীবাহী ট্রেনের মতো পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলও স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে