হামের উপসর্গে একদিনে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদন | প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৪:৩৮ পিএম
হামের উপসর্গে একদিনে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু

দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ১৯৪ জনের শরীরে হাম ও এর উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯ জনে।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে ১০ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে সাতজনের মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে ঢাকা বিভাগের তিনজন, সিলেট, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগের একজন করে শিশু রয়েছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন শনাক্ত ১ হাজার ১৯৪ জনের মধ্যে ১ হাজার ১৬৫ জনের শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। আর ২৯ জনের শরীরে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। এ সময়ে নিশ্চিত হামে কারও মৃত্যু হয়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ১৫ মার্চ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে মোট ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৪৫ জনের শরীরে। এর মধ্যে ১৯ হাজার ৯৩৩ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০৫ জন। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৪২ হাজার ৮৮৮ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন।

এই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন মোট ৯০৯ জন। আর নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ১০০ জনের। সব মিলিয়ে হাম ও এর উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ৯ জনে পৌঁছেছে।

ঢাকায় নতুন রোগী ও মৃত্যু বেশি

গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে, ৪২১ জন। চট্টগ্রামে ২৬২, সিলেটে ১৫৩, বরিশালে ১১৬, খুলনায় ৮৯, ময়মনসিংহে ৮২, রাজশাহীতে ২৮ এবং রংপুরে ১৪ জনের শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে।

একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকা বিভাগে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া সিলেট, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে একজন করে মারা গেছে।

১৫ মার্চ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত। এ বিভাগে ৭২ হাজার ৪৫৯ জনের শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ১২ হাজার ২২৪ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ৪০৭ জন।

চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে ৩৩ হাজার ১৯৮ জনের শরীরে। এর মধ্যে ২ হাজার ৭১১ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। এ বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে ৬৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বরিশালে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে ১৮ হাজার ৪৭৬ জনের শরীরে। সিলেটে ১২ হাজার ৫৪১, খুলনায় ১০ হাজার ৯৩৬, রাজশাহীতে ১০ হাজার ১৯, ময়মনসিংহে ৮ হাজার ১৫০ এবং রংপুরে ২ হাজার ৯৬৬ জনের শরীরে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে।

টিকাদানে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ডোজ

হাম পরিস্থিতির মধ্যে জাতীয় হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

কর্মসূচিতে ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ জনকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর বিপরীতে এ পর্যন্ত ১ কোটি ৯৭ লাখ ৫৫ হাজার ৩১২ ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের কভারেজ দাঁড়িয়েছে ১০৯ দশমিক ৭ শতাংশ।

বিভাগগুলোর মধ্যে ময়মনসিংহে টিকাদানের কভারেজ সবচেয়ে বেশি, ১১৫ শতাংশ। চট্টগ্রামে ১১২ দশমিক ৬, ঢাকায় ১১০ দশমিক ৪, রংপুরে ১০৯ দশমিক ৮, রাজশাহীতে ১০৮, খুলনায় ১০৫ এবং বরিশাল ও সিলেটে ১০৪ দশমিক ৪ শতাংশ করে কভারেজ হয়েছে।

আগে যেখানে হাম ছিল নিয়ন্ত্রণে

একসময় হাম বাংলাদেশে প্রায় ভুলে যাওয়া রোগে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছর সংক্রমণ ও মৃত্যুর চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। জনস্বাস্থ্যবিদেরা এর পেছনে টিকাদান কার্যক্রমে অবহেলা এবং পরে পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথাযথ পরিকল্পনার ঘাটতিকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হাম প্রতিরোধে টিকাদানের ক্ষেত্রে অবহেলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য প্রাথমিকভাবে দায়ী। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পিতভাবে কাজ না করার কারণেও পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

চলতি বছরের শুরুতেই হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও শুরুতে বিষয়টিতে যথেষ্ট নজর দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। মার্চ থেকে সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকে। এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এপ্রিল থেকে মে মাসজুড়ে গণটিকাদান কর্মসূচি চালানো হয়। তবে ওই কর্মসূচিতেও প্রায় ৪০ লাখ শিশু টিকার বাইরে থেকে যায় বলে জানানো হয়েছে।

জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক মাহমুদুর রহমান বলেছেন, দেশে এর আগে হামে এত মৃত্যু ও সংক্রমণ হয়েছে বলে তার জানা নেই। তার মতে, এবারের পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়েছে শিশুরা।

গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানেও এবারের পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট। ২০২৫ সালে দেশে হাম শনাক্ত হয়েছিল ১৩২ জনের। ২০২৪ সালে ২৪৭, ২০২৩ সালে ২৮২ এবং ২০২২ সালে ৩১১ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছিল।

জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল ইসলাম এ বারীর মতে, বিভিন্ন দেশের মধ্যে চলতি বছর বাংলাদেশেই হামের সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি হয়েছে। তার ভাষায়, এত বেশি সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

হামের প্রাদুর্ভাবের সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হওয়া মৃত্যুর হিসাবকে আলাদাভাবে রাখা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রতিবেদনে নিশ্চিত হামে মৃত্যু এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা পৃথকভাবে দেওয়া হচ্ছে। সর্বশেষ হিসাবে নিশ্চিত হামে ১০০ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ৯০৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে মোট মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯ জনে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে